ইতিহাস

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালি মুসলিম নারীদের অবদান

মূল উর্দু : মুহাম্মদ লাল চাঁদ শেখ
অনুবাদ : আরিফ খান সাদ

আধুনিক ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের উত্থানে উৎপাদন জগতে জাগে বিপুল চাঞ্চল্য। দেশে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন শিল্প-উদ্যোক্তাদের বাধ্য করে নতুন বাজার তৈরি করতে। শিল্প উৎপাদনে নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন হয় অতিরিক্ত কাচামাল, সাথে অতিরিক্ত শ্রমিকেরও উৎপাদন। এরই ফল স্বরূপ, শিল্প উদ্যোক্তা ও শাসকগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে নব্য ইউরোপীয় সাম্রাজ্য। পৃথিবীর পূর্ব দিকে যেসব দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ ও জনশক্তির প্রাচুর্য—পশ্চিমা ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো সেদিকেই পা বাড়ায় শাসকগোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় এবং সামনে বেড়ে সাম্রাজ্যবাদীদের দেশ দখলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ভারতীয় উপমহাদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাহ্যত ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে আগমন করলেও, বাস্তবে তাদের নজর ছিল এই ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জনশক্তির ওপর। এ উদ্দেশ্যেই কোম্পানি এই দেশকে দুর্বল করার যাবতীয় কৌশল অবলম্বন করে এবং নিজেদের তারা এমন শক্তিশালী ও স্বাধীন করে তোলে যে, স্থানীয় শাসকশ্রেণী তাদের সামনে অসহায় হয়ে পড়ে।
ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন মূলত ওই সময় থেকেই শুরু, যখন থেকে ইংরেজরা স্থানীয় শাসকদের ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করে দেয়। তারপর তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষমতা থেকে উৎখাতের চেষ্টাও শুরু করে। তারা স্থানীয় কৃষকদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয় এবং তাদের দিয়ে ইচ্ছে মতো চাষ করানো শুরু করে। একইভাবে এ অঞ্চলের মানুষের জ্ঞান-বিদ্যা, ধর্ম ও সংস্কৃতি নিজেদের মতো সাজিয়ে নিতে থাকে এবং ভারতবর্ষের ইতিহাস ও ধর্ম পরিচয়কে নতুন রূপে উপস্থাপনের আয়োজন করে। ভারতবর্ষের প্রতি ইংরেজদের এই স্বার্থান্বেষী মনোভাব ও নিপীড়নমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের প্রায় সর্বস্তরের মানুষ আন্দোলন ও সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের জন্য জীবনবাজি রেখে লড়াই করে। যেহেতু ইংরেজ শাসনের সূচনা হয় বাংলা অঞ্চল থেকে, তাই স্বাভাবিকভাবেই ভারতবর্ষে ইংরেজ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম পদক্ষেপও গ্রহণ করে বাঙালি জাতি। স্বাধীনতার আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে হিন্দু-মুসলমান, পুরুষ-নারী সর্বস্তরের মানুষ।
আনন্দের বিষয় হচ্ছে, ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম ও আন্দোলন বিষয়ে অনেক রচনাকর্ম সম্পন্ন হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অংশে ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বীকারোক্তিও রয়েছে। খোদ বঙ্গভূমিতে এমন অনেক কাজ হয়েছে, যাতে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আন্দোলনে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অবদান ও কৃতিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালি মুসলিম নারীদের অবদান ও কৃতিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে—এমন কোনো উল্লেখযোগ্য রচনাকর্মের সন্ধান মেলে না। ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী’ বইয়ের লেখক কমলা দাশগুপ্ত কেবল একজন মুসলিম নারী—দৌলতুন্নেছা সম্পর্কে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বাকি মুষ্টিমেয় কয়েকজন মুসলিম নারীর কেবল নাম উল্লেখ করেছেন বা এক-দুই বাক্য লিখে দিয়েছেন। ‘বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার মুসলিম নারী’ বইয়ের লেখকও তার রচনায় কেবল পাঁচজন বাঙালি মুসলিম নারীর কথা আলোচনা করেছেন, সাথে দুই-এক বাক্য মাত্র লিখেছেন। ড. সায়েকা হোসেন তার অভিসন্দর্ভে কয়েকজন মুসলিম নারীর কেবল নাম উল্লেখ করেছেন। কৃষ্ণচন্দ্র ঘোষও তার ‘ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিম নারীদের অবদান’ বইয়ে বাংলার মুসলিম নারীদের পরিবর্তে বেশিরভাগই উত্তর ভারতের নারীদের কথাই আলোচনা করেছেন। অন্যান্য গ্রন্থকার ও প্রবন্ধকারেরও এই একই অবস্থা। এজন্যই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বাংলার মুসলিম নারীদের অবদান সম্পর্কে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন ছিল। প্রবন্ধটি এ শূন্যতা পূরণেরই প্রাথমিক প্রচেষ্টা।
ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বলা হয়, ভারতবর্ষে স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা সরকারি উদ্যোগে হোক বা ব্যক্তি উদ্যোগে—এর শিকড় ছিল বাংলার জমিনে। অবিভক্ত বাংলায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে যেসব আন্দোলন-সংগ্রাম সর্বপ্রথম সাংগঠনিকভাবে বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে, তন্মেধ্যে তিতুমীরের (১৭৮২-১৮৩১) ‘তরিকায়ে মুহাম্মদিয়া আন্দোলন’ এবং হাজী শরীয়তুল্লাহর (১৭৮১-১৮৪০) ‘ফরায়েজী আন্দোলন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গভীরভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যায়, ইংরেজ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণও খুব স্বাভাবিক। উদাহরণ স্বরূপ প্রথমেই যার নাম আসে, অর্থাৎ তিতুমীর—তার মা আয়েশা বেগম স্বশরীরে নিজে ওই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষিত নারীদের ‘তারিকায়ে মুহাম্মদিয়া আন্দোলনে’ যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন এবং দরিদ্র পরিবারের নারীদের তিনি ইংরেজদের বিরোধিতায় ফারসি ভাষা-সাহিত্য শিক্ষা দিতেন। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষিত ও সাহসী নারী, যিনি নির্ভয়ে-নিঃশঙ্কচিত্তে বৃটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে আওয়াজ উচ্চকিত করেন। একইভাবে, হাজী শরীয়তুল্লাহর ব্যাপারে যখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষিত হয়, তখন তার মা বলেছিলেন, ‘আমার ছেলে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে, এটা আমার জন্য গৌরবের বিষয়।’ যখন হাজী শরীয়তুল্লাহর ইন্তেকাল হয়, তখন তার মা তরুণী ও যুবতী নারীদের সমন্বয়ে একটি দল গঠন করেন। এই দলের সদস্যরা ফরায়েজী আন্দোলনে সংগ্রামরত মুজাহিদদের ইংরেজদের নজর থেকে লুকিয়ে রাখতেন, আহত যোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রূষা করতেন, ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিতেন, বৃটিশ অস্ত্রাগারে আগুন ধরিয়ে অস্ত্র সংগ্রহ করতেন; মোটকথা, বৃটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও সংগ্রামে তারা পুরোদস্তুর অংশগ্রহণ করেন। দৃঢ়তার সাথে এ কথা বলা যায়, হাজী শরীয়তুল্লাহর মা ছিলেন একজন বিপ্লবী কমান্ডার। একইভাবে ১৮৫৭ সালে যখন ‘নীল বিদ্রোহ’ সংঘটিত হয়, ওই আন্দোলনের প্রাণপুরুষ এনায়েত খান ও বেলায়েত খানের পরিবারের সব নারী সদস্য তাতে অংশগ্রহণ করেন।
অবিভক্ত বাংলায় বাঙালি নারীদের মধ্যে, বিশেষভাবে মুসলিম নারীদের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের জাগরণ তৈরির কাজে প্রথম কোনো অবাঙালি নারী বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার থাকলে তিনি ‘বী-আম্মা’ (আবাদি বেগম)। স্বাধীনতা আন্দোলনে সংগ্রামী এ নারী—মাওলানা শওকত আলী ও মাওলানা মুহাম্মদ আলীর মা (স্বাধীনতা জননী) তার দুই সংগ্রামী পুত্রের কারামুক্তির রেজুলেশন মাথায় নিয়ে ১৯১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর কলকাতা পৌছেন। ১৯১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর কংগ্রেসের দ্বিতীয় সম্মেলনে বেশ জোরালো বক্তব্য রাখেন। একইসাথে তিনি ১৯১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সভায় একটি আহ্বানপত্র প্রেরণ করেন, সেটি পাঠ করেন বিচারপতি আব্দুল গাফফার। একই দিনে অনুষ্ঠিত দুই প্রোগ্রামের বক্তব্যে তিনি দুই পুত্রের কারামুক্তির চেয়ে বেশি জোর দেন দেশের স্বাধীনতা, ইংরেজদের জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম এবং দ্বীন ও স্বদেশের ভালোবাসার প্রতি। বী-আম্মার একটি স্বপ্নের জন্য জীবনের শেষ নিঃস্বাস পর্যন্ত সংগ্রাম করেছেন। তিনি বলতেন, ‘আমি দিল্লির লাল কেল্লার চূড়ায় আমাদের পতাকা উড়তে দেখি। আমার একান্ত বাসনা—লাল কেল্লা থেকে ফিরিঙ্গি পতাকা পড়ে যেতে দেখবো একদিন।’
১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন, ভারত ছাড়ো প্রভৃতি আন্দোলনে পুরুষদের পাশাপাশি কাধে কাধ মিলিয়ে নারীরা যেভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, তেমনি অনেক জুলুম-নির্যাতনও সহ্য করেছেন। এমনকি কিছু আন্দোলনের সূচনাই হয়েছে নারীদের মাধ্যমে। ভারতবর্ষের নারীদের বীরত্ব ও সাহস দেখে কর্নেল হডসন এক জায়গায় মন্তব্য করেন, ‘যে দেশের নারীরা এমন অনুভূতিসম্পন্ন ও বীরত্বের অধিকারী হয়, সেদেশে ইংরেজদের বিজয় ধরে রাখা কেবল গুটিকয়েক দেশ-বেঁচা গাদ্দারের নিকমহারামির ওপরই নির্ভরশীল।’ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুদ্ধের যাবতীয় আন্দোলন সফল করার জন্য এ দেশের মুসলিম নারীরা; বিশেষ করে বাংলার মুসলিম নারীরা বেশ বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাদের আত্মত্যাগ ও আত্মবিসর্জন চিরস্মরণীয়। এখন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেদের রক্তসিঞ্চনকারী বাংলার মুসলিম নারীদের কিছু পরিচয় তুলে ধরছি :
ফুল বাহাদুর বিবি : জন্ম ১৯১৬ সালে। বিয়ে হয় ঢাকার বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ) সুভাষপুর গ্রামে। শৈশবেরই বাবা-মাকে হারিয়েছেন। তাই তার লালন-পালন ও শিক্ষা-দীক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন বড় ভাই তমিজুদ্দীন, যিনি ছিলেন কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী সদস্য এবং ১৯৩২ সালের আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী। ফুল বাহাদুর বিবি তার এই ভাই থেকে স্বদেশপ্রেমের দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং স্বাধীনতার জন্য বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে পাইকপাড়ার রুদ্র দেবের সাথে মিলে মিছিল বের করা এবং ১৯৩২ সালে কংগ্রেসের সাথে আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। এর ফলে তিনি ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন। তাকে প্রথমে ঢাকা জেলখানা, তারপর বহরমপুর জেলখানায় কয়েদ করে রাখা হয়। কারামুক্তির পর তিনি আরো বীরবিক্রমে কংগ্রেসের সাথে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন।
হুসনে আরা বেগম : এই নারী স্বাধীনতার পক্ষে বিভিন্ন আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, যেমন, ‘লেডিস পিকেটিং বোর্ড, কলকাতা’, ‘নারী সত্যাগ্রহ কমিটি’, ‘রাষ্ট্রীয় মহিলা সংঘ’, ‘নিখিল জাতীয় নারী সংঘ’ ইত্যাদি। লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি বৃটিশ আইন ভঙ্গ করেন। তিনি ১৯৩০ থেকে ১৯৩২ সালে বিভিন্ন সম্মেলন ও মিছিলে অংশগ্রহণ করেন এবং সরব ভূমিকা পালনের অপরাধে জেলখানায় বন্দিজীবন অতিবাহিত করেন। হুসনে আরা বেগম সুভাষ চন্দ্র বসু ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম থেকে প্রভাবিত হয়ে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এসব অন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের পাশাপাশি তিনি দেশের ভালোবাসায় সমাজকল্যাণমূলক কাজেও যুক্ত ছিলেন। তিনি কাব্যচর্চা করতেন এবং ধর্ম-জাতি ভেদাভেদ না করে ঘরে ঘরে গিয়ে নারীদের দেশী পণ্য ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতেন। ব্যক্তিগত কর্মসূচির অংশ হিসেবে তিনি নারীদের ঘরে ঘরে গিয়ে আহ্বান জানাতেন, যেন তারা তাদের ঘরের পুরুষদের ইংরেজদের জেল-জুলুমের পরওয়া না করে স্বাধীনতার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেন। ১৯৩২ সালে তিনি কলকাতা ময়দানে বিপ্লবী নারীদের সমাবেশে স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করেন এবং বৃটিশ আইন ভঙ্গ করেন। পুলিশ তাকে আইন ভঙ্গ আন্দোলনের বিপ্লবী কর্মীদের সাথে প্রথমে আলীপুর সেন্ট্রাল জেল ও তারপর বহরমপুর জেলখানায় কয়েদ করে রাখে। আটক কয়েদিদের মধ্যে প্রায় ১৭৬ জন ছিলেন নারী এবং ছয়জন ছিলেন মুসলিম। জেলখানায় বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি বিদ্রোহাত্মক কবিতা রচনা করেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি কবিতা হচ্ছে, ‘মুক্তির বাণী হয়নি আজো রক্তাক্ষরে লেখা’। ১৯৩০ সালে চব্বিশ পরগণা জেলায় গুল বাহার বিবি ও দখিমন বিবির সাথে তিনি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। দখিমন বিবি আলম বাজারের জুট মিল থেকে এবং গুল বাহাদুর বিবি টালিগঞ্জ রাইস মিল থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
হালিমা খাতুন : ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে স্বাধীনতাকামীরা দুই প্রকারে অংশগ্রহণ করেন। এক. যারা কঠোরতার পথ এড়িয়ে চলতে পছন্দ করতেন। দুই. যারা কঠোর আন্দোলনে বিশ্বাস করতেন। দ্বিতীয় প্রকার আন্দোলনকারীদের একটি উদ্যোগ ছিল বাংলার ‘যুগান্তর পার্টি’। এতে হিন্দু-মুসলিম সব ধরণের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। এই আন্দোলনের সম্মুখ সারির একজন কর্মী ছিলেন রাজিয়া খাতুন, তার আলোচনা সামনে আসবে। রাজিয়া খাতুনের সাথেই ময়মনসিংহের হালিমা খাতুনের নাম চলে আসে; যিনি তার সাথে বিভিন্ন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। সভা-সমিতি পরিচালনা, নেতৃত্বদান ও স্বাধীনতার সংগ্রামে পূর্ণরূপে তিনি কৃতিত্বের সাক্ষর রাখেন। রাজিয়া খাতুনের সাথে ১৯৩০, ১৯৩২ ও ১৯৪২ সালের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন হালিমা খাতুন।
খাইরুন্নেছা খাতুন : খাইরুন্নেছা (১৮৭০-১৯১২) ছিলেন একজন উচ্চ শিক্ষিত বাঙালি মুসলিম নারী এবং স্বদেশী আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। এই বাঙালি মুসলিম নারী বৃটিশ ভারতে ওই সময় বৃটিশ পণ্য বয়কট ও স্বদেশীয় পণ্য ব্যবহারে সচেতন ছিলেন, যখন বাঙালি পুরুষরাও এ দিকে বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে শুরু করেননি। তিনি বাঙালি মুসলিম নারীদের স্বদেশী আন্দোলনে যোগদান এবং বাংলায় উৎপাদিত পণ্য ব্যবহারে জনমত গড়ে তোলার কাজ করতেন। তিনি নারীদের জোর দিয়ে বলতেন, যেন তারা বিদেশী কাপড়, কসমেকটিস, সাজসজ্জার জিনিসপত্র ও থালা-বাসন ক্রয় না করে। নারীদের তিনি আন্তরিকভাবে অনুরোধ করতেন, যেন তারা ল্যাভেন্ডারের পারফিউম ব্যবহার না করে, বরং গোলাপ ফুলের সুগন্ধি ব্যবহার করে। তিনি এও বলতেন—মোম্বাই, ঢাকা, পাবনা, মুরশিদাবাদ ও নদীয়া প্রভৃতি অঞ্চলে বানানো কাপড় যেন তারা ক্রয় করে। দেশীয় পণ্য ব্যবহারে জনসচেতনা গড়ে তুলতে তিনি ‘স্বদেশানুরাগ’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেন, যা ‘নবনূর’ পত্রিকায় ছাপা হয়। এক জায়গায় বেশ জোর দিয়ে লিখেছেন, ‘স্বদেশী আন্দোলন অর্থৈনৈতিক সংকট দূরীকরণ ও দেশীয় শিল্প বিকাশের মাধ্যমে দরিদ্র মুসলমানদের উপকার করবে।’ প্রথম দিকের মুসলিম নারী লেখিকাদের মধ্যে সম্ভবত খাইরুন্নেছা প্রথম নারী—যিনি আধুনিক সমাজ ও রাজনীতি প্রশ্নে নিজের চিন্তাদর্শন উপস্থাপন করেছেন। তিনি ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধেও উচ্চকণ্ঠ ছিলেন।
দৌলতুন্নেছা খাতুন : জন্ম ১৯১৮ সালের জুন মাসে, বগুড়া জেলার (বর্তমান বাংলাদেশ) সোনাতলা গ্রামে। তার বাবার নাম মুহাম্মদ ইয়াসিন ও মায়ের নাম নুরুন্নেছা খাতুন। বাবা-মা তাকে খুব অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন, যখন তার বয়স ছিল মাত্র আট বছর। তিনি জুনিয়র প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি লাভ করেন। তার বিয়ে হয় যশোর জেলার মহকুমা মাগুরার বাসিন্দা ড. হাফিজুর রহমানের সাথে। উল্লেখ্য, ওই যুগে নারীদের উচ্চশিক্ষা ভালো চোখে দেখা হতো না। এতদসত্ত্বেও তার বাবা-মা সামাজিক রীতি-নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে বারো বছর বয়স পর্যন্ত ‘ঢাকা ইডেন হাই স্কুলে’ পড়ালেখা করান। এরপর তার শ্বশুরালয়ে রুখসতি হয়। পড়ালেখার প্রতি তীব্র আগ্রহের কারণে দৌলতুন্নেছা খাতুন শ্বশুরালয়ে গিয়েও পড়াশোনা অব্যহত রাখেন।
দৌলতুন্নেছা খাতুন বারো বছর বয়স থেকেই বিভিন্ন স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। ১৯৩০ সালে লবণ সত্যাগ্রহ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৩২ সালে ‘আইন অমান্য আন্দোলন’ চলাকালে তিনি কয়েকজন নারীকে সাথে নিয়ে ‘গাইবান্ধা মহিলা সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন। ওই সময় তার বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ। তবে তিনি তার দায়িত্ব সম্পর্কে ছিলেন পূর্ণ সচেতন ও পরিণত বয়সীদের মতো চৌকস। সমিতির সেক্রেটারি ছিলেন তিনি নিজে, সভানেত্রী ছিলেন মহামায়া ভট্টাচার্য, সহ-সভানেত্রী ছিলেন দক্ষবালা দাস। এই সমিতি মিছিল, পিকেটিং, ১৪৪ ধারা অমান্য ও জনসাধারণের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা প্রচারের কাজ করতে থাকে পূর্ণোদ্যমে। আশপাশের প্রায় আট গ্রামের (বামুনডাঙা, সুরতখালি, নলডাঙা, বিজয়ডাঙা, ফুলছড়ি, কূপতলা, তুলসীঘাট প্রভৃতি) নারীরাও এই আন্দোলনে যোগদান করেন। দৌলতুন্নেছা যখন গ্রামে বক্তৃতা করতেন, তখন গ্রামের তামাম হিন্দু-মুসলমান নারীরা তার বক্তৃতা শুনতে চলে আসতেন। পরিপূর্ণ পর্দানসীন মুসলিন তরুণি, বয়সেও ছোট, আবেগদীপ্ত বক্তৃতা—সব মিলিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে অন্যরকম প্রভাব বিস্তার করতো। তিনি আবেগভরা বক্তৃতা দিয়ে সবাইকে সমিতি ও আন্দোলনে যোগ দিতে আহ্বান করতেন।
এসব কারণে পুলিশ তার স্বামীকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং তার বাড়িকেও বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। এতদসত্ত্বেও তিনি আন্দোলন থেকে পিছপা হননি বরং এসব হয়রানির বিরুদ্ধে শহরের রাজপথে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। তারপর তাকেও গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার করে তাকে, মহামায়া ভট্টাচার্য ও প্রতিভা সরকারকে প্রথমে রাজশাহী জেলখানা, তারপর বহরমপুর জেলখানায় বন্দি রাখা হয়। তার আন্দোলনে জিয়াউন্নাহর, রোকেবা খাতুন, শামসুন্নাহার, রোকেয়া খাতুন প্রমুখ নারী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন, কিন্তু পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি। দৌলতুন্নেছার অনুপস্থিতির দিনগুলোয় এসব নারী আন্দোলন অব্যহত রাখার চেষ্টা করেন। কারামুক্তির পর তিনি দেখেন আন্দোলন স্থবির হয়ে পড়েছে। এজন্য তিনি পড়ালেখায় মনোনিবেশ করেন এবং বিএ পাশ করেন। পড়ালেখার পাশাপাশি সমিতির কাজও অব্যহত রাখেন এবং জনকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের সময় তিনি ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ গঠন করেন। তিনি সাহিত্যচর্চা করতেন এবং কয়েকটি গল্পও লেখেন। ভারত ভাগের পর তিনি ঢাকায় বসবাস শুরু করেন এবং রাষ্ট্রীয় ও জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজে যুক্ত হন। ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসের ৪ তারিখে তিনি বিদায় জানান এই ক্ষণস্থায়ী জগতকে।
রাদু বিবি : স্বাধীনতা অন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন সম্মুখভাগের সংগ্রামী নারী। কলকাতার নারীদের নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মহিলা কর্মী সমাজ’। তার নেতৃত্বে নারী কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে সাধারণ মানুষকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতেন। সংগঠনের পক্ষ থেকে পঁচিশ-ত্রিশ জন নারীর দল বানিয়ে ঘর ভাগ করে দেওয়া হতো। এই আন্দোলনের অধীনে অনুষ্ঠিত সভাসমূহের মধ্যে ইন্দ্র প্রভা মজুমদার ও রাদু বিবির সভা খুব প্রসিদ্ধি লাভ করে। এসব সভায় অংশগ্রহণকারী নারীদের বেশ বড় অংশ তাদের ব্যক্তিত্বে ও আহ্বানে নিজেদের অলঙ্কার-গহনা খুলে দিয়ে দেন। হাতের চুড়ি খুলে তারা এই শপথ করেন—যতদিন ভারতবর্ষ স্বাধীন না হবে, ততদিন তারা অলঙ্কার-গহনা পরিধান করবেন না।
রাজিয়া খাতুন : জামালপুরের (বর্তমান ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ) রাজিয়া খাতুন তার বাবা নাসিরুদ্দীন ও অন্যান্যদের সাথে যুগান্তার পার্টিতে অংশগ্রহণ করেন। নাসিরুদ্দীন ছিলেন এ পার্টির আঞ্চলিক নেতা। রাজিয়া খাতুন বিভিন্ন হামলা অভিযানেও অংশগ্রহণ করেন। ফলে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে জেলখানার শাস্তি তাকে লক্ষ থেকে দূরে সরাতে পারেনি বরং আরো বিপুল বিক্রমে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় হন। তিনি প্রথম বাঙালি মুসলিম নারী রাজনৈতিক কর্মী এবং সম্মুখসারির লড়াকু নারী কর্মী হিসেবে গৌরব অর্জন করেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে রাজিয়া খাতুন বিশেষ কৃতিত্বের সাক্ষর রাখেন। বিপ্লবাত্মক যে কোনো আন্দোলনে ও প্রয়োজনে তিনি নিজেকে সর্বদা প্রস্তুত রাখতেন। এসব আন্দোলনের কারণে বেশ কয়েকবার তিনি গ্রেফতার হন এবং জেলখানার অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেন। ১৯৩০, ১৯৩২, ১৯৪২ সালের তীব্র আন্দোলনে তিনি অপ্রতিরোধ্যভাবে অংশগ্রহণ করেন। এসব আন্দোলনে হালিমা খাতুন (যার আলোচনা পূর্বে গিয়েছে) তার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশগ্রহণ করতেন।
রাজিয়া খাতুন চৌধুরানী : রাজিয়া খাতুন চৌধুরানী ১৯০৭ সালে নোওয়াখালী জেলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র চিত্তরঞ্জন দাশের সাথে ডেপুটি এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে কাজ করতেন। রাজিয়া খাতুনের শৈশব জীবন কাটে কলকাতায়, তারপর প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন নোয়াখালি জেলায়। তিনি আরবি, ফারসি, উর্দু, বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তার বিয়ে হয় কুমিল্লা জেলার জমিদার পরিবারের ছেলে আশরাফুদ্দিন আহমদ চৌধুরীর সাথে। আশরাফুদ্দিন ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। রাজিয়া খাতুন ছিলেন উচ্চশিক্ষিত নারী এবং ছোটগল্পের লেখিকা হিসেবে প্রসিদ্ধ। তিনি তার গল্পে মুসলিম নারীদের শিক্ষা, সমাজে নারীদের অবস্থান, পর্দাপ্রথা, সমাজে প্রচলিত রীতি-রেওয়াজ থেকে মুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে লেখালেখি করতেন। তার একটি প্রবন্ধ ‘সমাজে ও গৃহে নারীর স্থান’ খুবই প্রসিদ্ধি লাভ করে। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ মেলে ‘শ্রমিক’ শিরোনামের প্রবন্ধ থেকে। এ প্রবন্ধে তিনি ‘খেলাফত আন্দোলন’ ও ‘স্বদেশী আন্দোলন’-এর গুরুত্ব ও প্রয়োজন সম্পর্কেও আলোচনা করেন। তিনি দেশীয় পণ্য ক্রয় ও ব্যবহার সম্পর্কে লেখালেখি করতেন এবং বাস্তব জীবনেও সবসময় দেশীয় খাদি কাপড় পরিধান করতেন। এমনকি তার বিয়ের অনুষ্ঠানেও তিনি দেশীয় খাদি কাপড়ের শাড়ি পরিধান করেন। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা-স্বকীয়তা রক্ষার সংগ্রামে লড়াইরত যোদ্ধাদের জন্য চাঁদা সংগ্রহেও কাজ করেন। ১৯৩৪ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে এই নারীর ইন্তেকাল হয়।
রানা বানু : ১৮৮৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বামুত্রা গ্রামে জন্ম। তিনি ১৯৪২ সালে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরপুরের মিছিলে নন্দিগ্রাম পুলিশ স্টেশনে হামলার সময় পুলিশের গুলিতে তিনি আহত হন এবং দেশের জন্য শাহাদাতের গৌরব অর্জন করেন।
রোকেয়া বেগম : ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই নারী। তার পরিবার ‘সাবেরি’ নামে পরিচিত ছিল। তার বিয়ে হয় সাখাওয়াত হোসেনের সাথে, যিনি ছিলেন উদারমনা ও নারীশিক্ষার সমর্থক। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে রোকেয়া বেগম প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকলেও পরোক্ষভাবে ছিলেন অবশ্যই। তিনি কেবল নারীশিক্ষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামেই ক্ষান্ত ছিলেন না, নারীদের সার্বিক জাগরণেরও প্রবক্তা ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত স্কুল ‘সাখাওয়াত হোসেন মেমোরিয়াল স্কুল’-এ অধ্যায়নকারী তরুণিরা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে অপ্রতিরোধ্যভাবে অংশগ্রহণ করে। তিনি বেশ কিছু বই লিখেছেন। যেমন—মতিচূর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, সুলতানার স্বপ্ন, মুক্তিফল ইত্যাদি। শেষোক্ত বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘নারীদের সহযোগিতা ছাড়া কেবল পুরুষদের চেষ্টায় স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব না’। বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রবন্ধে তিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে শাহাদাত বরণকারীদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন আবেগ ও ভালোবাসার সাথে। ১৯৩২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ৫২ বছর বয়সে তার ইন্তেকাল হয়।
বেগম রোকেয়া তার ‘নীরিহ বাঙালি’ বইয়ে (১৯০৪ খ্রি) লিখেছেন, ‘সমগ্র বাঙালি জাতি একই বংশের মানুষ’। একইভাবে তিনি ‘নিরূপম বীর’ কবিতায় ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী হিন্দু ব্যক্তিত্ব কানাই লালের প্রতি মর্সিয়া প্রকাশ করেন। এসব থেকে তার দেশপ্রেমের পরিচয় মেলে। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অপরাধে কানাই লালকে বৃটিশ আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয়। তিনি রূপকথার গল্প ‘মুক্তিফল’-এ (১৯২১ খ্রি) বলেন, ‘হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ছাড়া ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের সম্ভাবনা খুবই কম’। একইভাবে তিনি আরেকটি কবিতা ‘আপীল’-এ (১৯২২ খ্রি) ভদ্রলোকদের (হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিজাত শ্রেণি) ইংরেজদের প্রতি আনুগত্য ও সরকার প্রদত্ত সম্মাননা ও পদক রক্ষার জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ না করায় কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেন।
জোবেদা খাতুন চৌধুরানী : ১৯০১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের কঠোর রক্ষণশীল পরিবেশের কারণে বিশেষ কোনো শিক্ষালাভের সুযোগ হয়নি। আঠারো বছর বয়সে তার বিয়ে হয় খান বাহাদুর আব্দুর রহিম চৌধুরীর সাথে। জোবেদা খাতুনকে ওইসব বাঙালি মুসলিম নারীদের মধ্যে গণ্য করা হয়, যারা ১৯৩০ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিভিন্ন ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯২৭ সালে সিলেটের একটি সভায় তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম, এ কে ফজলুল হক, ড. সাদুল্লাহ প্রমুখের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ বৈঠক থেকে তার ভেতর স্বদেশপ্রেম ও দেশের জন্য কাজ করার চেতনা জাগ্রত হয় এবং ১৯২৭ সালে অফিশিয়ালি কংগ্রেসে যোগদান করেন। তিনি ‘শ্রীহট্ট মহিলা সংঘ’-এর সভানেত্রী নির্বাচিত হন, যা কংগ্রেসের সাথে যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতো। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিবাদ সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সর্বদা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের পক্ষে কথা বলতেন, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিলে বেরিয়ে পড়তেন এবং বিভিন্ন কৃষক আন্দোলনে সরব ভূমিকা পালন করতেন। ‘ভানুবিল কৃষক-প্রজা আন্দোলন’-এও অংশগ্রহণ করেন তিনি।
জুলায়খা বেগম : ১৮৯৪ সালে বাংলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আফতাবুদ্দিন, যিনি বাগদাদ থেকে হিন্দুস্তানে হিজরত করেন এবং কলকাতায় বসতি স্থাপন করেন। ১৯০০ সালে এই নারীর বিয়ে হয় প্রসিদ্ধ সংগ্রামী পুরুষ মাওলানা আবুল কালাম আজাদের (১৮৮৮-১৯৫৮) সাথে। মাওলানা আজাদ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দুই অঙ্গনেই শীর্ষ ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাদৃত ছিলেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে মাওলানাকে অসংখ্যাবার জেলখানায় যেতে হয়েছে, পরিবারে জীবন-জীবিকার সংকট এসেছে, একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গ জীবন ভোগ করতে হয়েছে—এসবই ছিল জুলায়খা বেগমের জীবনে অনেক কঠিন পরীক্ষার মুহূর্ত। কিন্তু জীবনব্যাপী এ সব পরীক্ষা তিনি হাসিমুখে সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করেন, কখনো অভিযোগ-অনুযোগের একটি হরফও তার মুখ থেকে বের হয়নি। মাওলানা নিজেও এ বিষয়ে স্বীকারোক্তি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জুলায়খা বেগম আমার জীবনে একজন সঙ্গীমাত্র নন, বরং আমার জীবনের সব অপ্রীতিকর অবস্থা তিনি প্রশান্ত মনে ও হাসিমুখে সহ্য করেছেন। তিনি মানসিক ও চিন্তা-বিশ্বাসে ছিলেন আমার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডে ছিলেন একান্ত সহচর ও সাহায্যকারী।’
জুলায়খা বেগমের সুদৃঢ় মনোবল ও দেশপ্রেমের প্রমাণ মেলে একটি চিঠি থেকে, যা তিনি মহাত্ম্যা গান্ধীকে লিখেছিলেন মাওলানা আজাদের দ্বিতীয়বার গ্রেফতারি ও আদালতে মুকদ্দমার রায় শোনার পর। চিঠিতে তিনি লিখেছেন :
‘আমার স্বামী মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মুকদ্দমার রায় শুনেছি আজ। তাকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই শাস্তি তো এক দিক থেকে কম মনে হচ্ছে, কারণ এরচেয়ে কঠোর শাস্তির খবর শোনার জন্য আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। দেশ ও জাতির সেবায় আত্মোৎসর্গকারী একজন মানুষকে যদি এমন জেল-জুলম দেওয়া হয়—আপনি স্বীকার করবেন মানুষটির সাথে অনেক বড় বে-ইনসাফি করা হয়েছে; অন্তত এসব তো তার প্রাপ্য ছিল না। আমি আপনাকে একটি বিষয়ে অবগত করতে এই দুঃসাহস করছি—তাকে গ্রেফতারের কারণে বাংলা প্রদেশে তার কাজের জায়গা খালি পড়ে আছে। এজন্য আমি নাচিজ উক্ত সেবায় আত্মনিয়োগ করছি। যেন তার কাজগুলো যথারীতি অব্যহত থাকে, যেভাবে তার উপস্থিতিতে কাজগুলো বাস্তবায়ন হতো।… আমার স্বাস্থ্যগত দিকে লক্ষ করে যদিও মাওলানা চান না, আমি কষ্ট ও পরিশ্রমের কাজে অংশগ্রহণ করি; কিন্তু তার শাস্তিভোগের পর আমি নিয়ত করেছি, আমার নাচিজ অস্তিত্বকে এই মহান গুরুদায়িত্ব পালনে ওয়াকফ করে দিবো।’
এই পত্র থেকে প্রমাণ মেলে, জুলায়খা বেগম ওই সময় ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবগত ছিলেন। আরো প্রমাণ মেলে, তিনি কেবল মাওলানা আজাদকে সার্বিকভাবে সঙ্গ দিয়েই থেমে থাকেননি, বরং নিজেও স্বাধীনতা আন্দোলনে মাওলানার অনুপস্থিতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। জুলায়খা বেগম ক্রমাগত নিঃসঙ্গতা ও অসুস্থতা ভরা জীবন সংগ্রাম শেষে ১৯৪৩ সালের ৯ এপ্রিল বিদায় জানান এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে। আর ওই সময় তার স্বামী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন আহমদনগর জেলখানায়।
জোহরা বেগমসুলতানা বেগম : এই দুই বোন ছিলেন বাংলা প্রদেশের প্রফেসর আব্দুর রহিমের দুই কন্যা। মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে ঘেরাও কর্মসূচিতে (picketing) যোগদানের অপরাধে ১৯৩০ সালে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত নারীদের মধ্যে সম্ভবত এই দুই নারী প্রথম। আবেদা বানু বেগম অভ্যূদয় বিষয়ক রচনা “Women in India’s Freedom Struggle” (৩০ আগস্ট, ১৯৩২ খ্রি)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, এই দুইজনই প্রথম নারী, যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি করা হয়। তাদের বাবা ছিলেন অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির মেম্বার। এই দুই বোনকে মাদকদ্রব্য ও বৃটিশ কাপড়ের দোকানের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ ও সেসব বন্ধ করে দেওয়ার অপরাধেও গ্রেফতার করা হয়।
মাতঙ্গিনী হাজেরা : ১৮৬৯ সালে তমলুক শহরের (মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ) হোগলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্রের কারণে বাবা-মা তাকে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন একজন বয়স্ক ব্যক্তির সাথে, যেন মেয়েটার অন্তত খাদ্যের যোগান হয়। কিন্তু মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি বিধবা হয়ে যান। বয়সে তার চেয়েও বড় সৎ-পুত্ররা তাকে কেবল উত্তরাধিকার থেকেই বঞ্চিত করেনি, বরং ঘর থেকেও বের করে দেয়। এরপর তিনি একটি ঝুপড়ি ঘরে অবস্থান নিয়ে শ্রমিক হিসেবে জীবন যাপন শুরু করেন। বিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে দেশ জুড়ে বিপ্লবী ও আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন শহরে-গ্রামে মিছিল বের করতে শুরু করে। এসব মিছিলের কোনো একটিতে হাজেরা অংশগ্রহণ করেন। উপস্থিত নেতৃবৃন্দের বক্তৃতা শুনে তিনি সংগ্রামে অনুপ্রাণিত হন। ওই সময়ই তিনি ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার আন্দোলনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর থেকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তিনি সংগ্রাম চালিয়ে যান।
মাতঙ্গিনী হাজেরা কংগ্রেসের সোচ্চার ও সক্রিয় সদস্য হিসেবে বিভিন্ন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। নিজ হাতে চরখা চালিয়ে কাপড় তৈরি করতেন এবং সবসময় খাদি কাপড় পরিধান করতেন। লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে তিনি পুরোদমে জড়িয়ে পড়েন, নিজে লবণ উৎপাদনের কাজ করে বৃটিশ আইন ভঙ্গ করেন। এই অপরাধে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশ তাকে শাস্তিস্বরূপ অনেক দীর্ঘ পথ পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যায়। এক পর্যাযে তিনি ক্লান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে যান। জেলখানা থেকে বের হওয়ার পর তিনি চৌকিদারি ট্যাক্সের বিরুদ্ধে মিছিল বের করেন এবং পুলিশ দ্বিতীয়বার তাকে গ্রেফতার করে। তিনি ১৯৩০ সালে মে মাসে মেদিনীপুর জেলায় চলমান আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এভাবে তিনি কংগ্রেসের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যোগদানের জন্য ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে বেড়ান। ১৯৩৩ সালে শ্রীরামপুরে (হোগলা, পশ্চিমবঙ্গ) অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের মহকুমা সম্মেলনেও অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে তিনি বেশ মারাত্মকভাবে আহত হন।
১৯৪২ সালে যখন মহাত্মা গান্ধী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দেন, তখন তমলুক শহরের প্রায় পঁচিশ হাজার মানুষ -যাদের মধ্যে প্রায় ছয় হাজার নারী ছিলেন- পুরো শহর জুড়ে মিছিল বের করে, হরতালের ডাক দেয় ও বিভিন্ন সরকারি অফিস দখল নিয়ে নেয়। আদালত দখলকারী দলের নেতৃত্বে ছিলেন মাতঙ্গিনী হাজেরা। এ দলে ছিলো প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এবং তাদের অধিকাংশই নারী। মিছিল যখন আদালতের কাছাকাছি চলে যায়, তখন পুলিশ সার্জেন্ট ১৪৪ ধারা আইন ঘোষণা করে এবং সামনে অগ্রসর হলে গুলি করার হুঁশিয়ারি জানিয়ে দেয়। এই অবস্থায় হাজেরা সাথে থাকা নারীদের থেমে যেতে বলেন এবং নির্দ্বিধায় সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বলতে থাকেন, ‘আমরা দেশের স্বাধীনতা আনবো, তোমরা স্বদেশীর বুকে গুলি করো না’। কিন্তু পুলিশ তার বাহুতে গুলি করে। তবু তিন সামনে এগিয়ে যান। পুলিশ দ্বিতীয়বার গুলি করে। তবুও তিনি সামনে এগিয়ে চলেন। শেষে তার কপালে গুলি লাগে। তবু তিনি মিছিলের পতাকা ভূলুণ্ঠিত হতে দেননি। তারপর যখন একজন তার হাত থেকে পতাকা ধরে ফেলে, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আত্মত্যাগের এই তরতাজা দৃশ্য দেখে জনতা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে এবং চূড়ান্ত বিক্রমে আদালত আক্রমণ করে দখলে নিয়ে নেয়। এভাবেই ১৯৪৪ সালে তমলুক শহরে সাধারণ মানুষের অধিকার ও শাসন প্রতিষ্ঠা হয়। তবে গান্ধীর জোর নির্দেশে তা স্থগিত করা হয়। স্বদেশের ভালোবাসায় আত্মবিসর্জন দিয়ে ৭৩ বছর বয়সে শাহাদাত বরণ করেন মৃত্যুঞ্জয়ী মাতঙ্গিনী হাজেরা।
মাতঙ্গিনী হাজেরা একজন জানবাজ সংগ্রামী নারী হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন হৃদয়বান মানুষ। ১৯৩৩ সালে সমগ্র দেশে যখন প্লেগ মহামারী ছড়িয়ে পড়ে, তিনি খুব ব্যথিত হন এবং পীড়িত মানুষকে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেন। ওই দুঃসময়ে তিনি দেশ-জাতি-ধর্ম ভেদাভেদ না করে মানুষ নির্বিশেষে সবার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এমনকি অনেক ইংরেজ অফিসার ও তাদের পরিবারের সদস্যদেরও খেদমত করেন তিনি।
মাজেদা হাসিনা বেগম : তিনি ছিলেন কলকাতার মানুষ। পরিবার ছিল খুবই দরিদ্র। এতদসত্ত্বেও তিনি ছিলেন অসাধারণ সাহসী, সংগ্রামী চেতনার অধিকারী এবং পুলিশের দমন-পীড়ন ও বৃটিশ শাসনের বে-ইনসাফির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ। এসব কারণে তাকে দুই বার গ্রেফতার করা হয় এবং কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই পরিষ্কার। সাধারণ মানুষের অধিকার সম্পর্কে ছিলেন উদার ও পূর্ণ সচেতন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই নারী জেলখানায় বন্দি জীবন কাটান। কারামুক্তির পর ফের পুলিশি হয়রানি, সামাজিক বৈষম্য, মুসলিম লীগের পক্ষপাতমূলক আচরণ ইত্যাদির বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু হয়।
আরো কয়েকজন মুসলিম নারী : ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে আরো অনেক নারী অংশগ্রহণ করেন, তাদের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না, তবে আন্দোলনকারীদের তালিকায় তাদের নাম জানা যায়। এসব নারীদের মধ্যে ঢাকার গোলাম জিলানীর মা শামসুন্নেছা বেগম ও তার স্ত্রী রওশন আরা বেগমের নাম বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়। এছাড়াও ঢাকার আসিফ আলী বেগের স্ত্রী রায়সা বানু বেগম, আখতার হুসাইন চৌধুরীর স্ত্রী বদরুন্নেছা বেগম প্রমুখ নারীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই দুই নারী ১৯৩০ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত চলমান বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের শুধু স্বশরীরে অংশগ্রহণ করেই ক্ষান্ত ছিলেন না, তারা বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহযোগিতাও প্রদান করেন। এমনকি তারা নিজেদের অলঙ্কার-গহনা সব স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য দান করে দেন। একইভাবে ফজিলতুন্নেছা, হামিদা খানম, নুরুন্নেছা খাতুন, দয়া বানু দানী, বেগম কাইয়ুম, হাজিমুন্নেছা খাতুন প্রমুখ নারী স্বাধীনতা আন্দোলনে বিভিন্ন উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেন। শেষোক্ত নারীকে কলকাতা জেলখানায় বন্দি করা হয়েছিল। বান্না বিবিকে ১৯৩২ সালে মদনপুরের পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং বন্দিত্বকালে তার ওপর লজ্জাজনক নিপীড়ন চালানো হয়। এছাড়াও জলপাইগুড়ি বিধানসভার মেম্বার আব্দুস সামাদের স্ত্রী লায়লা আহমাদ, বর্ধমান জেলার মনসুর হাবিবুল্লাহর স্ত্রী মাকসুদা বেগম, কলকাতার কৃষক অধিকার আন্দোলনের নেতা কুতুবুদ্দিন আহমেদের বোন নাজমুন্নেছা প্রমুখ নারী উল্লেখযোগ্য। এসব নারী আন্দোলনকর্মীরা কলকাতার দরিদ্র বস্তিগুলোতে গিয়ে মানুষকে স্বাধীনতা আন্দোলনে জনমত গঠনের কাজ করতেন। এ ছাড়াও আরো অসংখ্যা বাঙালি মুসলিম নারী ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন, যাদর নাম কোনো সরকারি-বেসরকারী নথি বা রেজিস্টার তালিকায় লিপিবদ্ধ নেই কিংবা তারা পুরোপুরি নাম-পরিচয়হীন অখ্যাত-অপরিচিত রয়ে গেছেন।
সর্বশেষ কথা : এই প্রবন্ধে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মাত্র কয়েকজন বাঙালি মুসলিম নারীদের কথা আলোচনা করা হলো। এর বড় একটি কারণ হচ্ছে, এ সম্পর্কে তথ্য ও উৎস খুবই কম ও অসম্পূর্ণ। দ্বিতীয় আরেকটি কারণ হচ্ছে, মুসলিম সমাজে নিজেদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে অনাগ্রহ। আরেকটি কারণ হতে পারে, বাংলার হিন্দু নেতৃবৃন্দ জাতীয় আন্দোলনকে ধর্মীয় মোড়কে উপস্থান করেছেন। উদাহরণত, অরবিন্দ ঘোষ স্বাধীনতা আন্দোলনকে মা-কালীর সাথে উপমা দিয়েছেন। বিপিন চন্দ্র পাল একে কালীর পূজার আদলে উপস্থাপন করেন। চিত্তরঞ্জন দাস বৈষ্ণব মতাদর্শে প্রভাবিত ছিলেন, তিনি তার কবিতায় স্বাধীনতা আন্দোলনকে সেভাবেই চিত্রিত করেছেন। সুভাষ চন্দ্র বসু ছিলেন রামকৃষ্ণ দ্বারা প্রভাবিত, তিনি প্রত্যেকটি আন্দোলনকে তার চিন্তাদর্শনের সাথে মিলিয়ে দেন। স্বামী বিবেকানন্দ জাতীয় আন্দোলনের উদ্দেশ্যের সাথে বেদান্ত দর্শনকে একীভূত করে দেন। এসব কারণেও অনেক মুসলমান স্বাধীনতার আন্দোলনগুলোতে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেন। আরেকটি কারণ হচ্ছে, মুসলিম নারীদের শিক্ষাচর্চায় পিছিয়ে থাকা; এর ফলে নারীরা রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনবোধ সম্পর্কে বে-খবর থাকতো। সাথে ছিল প্রতিকূল পরিবেশ, পর্দাপ্রথা, অল্প বয়সে বিয়ে-শাদী—এসব কারণে এবং সামাজিক রুসুম-রেওয়াজের ভারে তারা দুর্বল ও কমজোর হয়ে পড়তো। এতদসত্ত্বেও বাঙালি মুসলিম নারীরা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রায় সব স্তরেই দুঃসাহসিকতার সঙ্গে কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছেন। বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও মিছিলে অংশগ্রহণ করেছেন, বড় বড় প্রতিবাদ সমাবেশে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ইংরেজদের গোপন অস্ত্রভাণ্ডার কিংবা গোপন কোনো উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের দায়িত্বশীলদের কাছে সরবরাহ করেছেন। আন্দোলনের মাঠে সরব ভূমিকা পালনের শাস্তি স্বরূপ তারা ইংরেজদের কঠোর প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছেন। তন্মধ্যে অনেক নারী জেলখানার অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করেছেন। আর অনেক নারী তো সংগ্রামের রাজপথে জীবনবাজি রেখে আত্মত্যাগের স্বাক্ষর এঁকে বরণ করেছেন শহীদের মর্যাদা।


লেখক :
মুহাম্মদ লাল চাঁদ শেখ
রিসার্চ স্কলার, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া, দিল্লি, ইন্ডিয়া।

অনুবাদক :
আরিফ খান সাদ
শিক্ষক, জামিয়া দারুল ইনআম; সহ-সম্পাদক, দৈনিক সময়ের আলো; ঢাকা, বাংলাদেশ।

প্রবন্ধ-উৎস :
মাসিক মাআরিফ (উর্দু), সেপ্টেম্বর-২০২৩; ভলিউম ২১০, নবম সংখ্যা।
মুখপত্র, দারুল মুসান্নিফিন শিবলী একাডেমী, আজমগড়, উত্তর প্রদেশ, ইন্ডিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *