স্মৃতিচারণ

হরফে হরফে জ্বলে জোনাকির আলো-১

হরফে হরফে জ্বলে জোনাকির আলো

আরিফ খান সাদ

 

এক.

২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস তখন। বাজারে নতুন একটি মাসিক পত্রিকা এসেছে, নাম ‘আল-কাউসার’। পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে একটি লেখায় চোখ আটকে গেলোÑ ‘এখনো জোনাকী জ্বলে’। লেখক মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ। নয় পৃষ্ঠার একটি অপার্থিব দিলছোঁয়া সফরনামা। ভাষা যে প্রাণবান ও জীবন্ত হতে পারে, কাগজের লেখা যে মুখরিত হতে পারে, হরফ যে সরব হয়Ñ এ লেখা পড়েই প্রথম অনুভব করলাম সেদিন। পাঠমুহূর্তজুড়ে মনে হলো আমিও যেনো লেখকের সাথে সফরে শামিল হয়েছি।  হরফে হরফে আমিও সফরের একজন হয়ে আছি। পড়তে পড়তে একটা লাইনে একজনের দেখা পেলাম। লেখকের ভাষায়Ñ ‘আতিকুল্লাহ হলো সফরসঙ্গী। সে এখন মাদরাসাতুল মাদিনার শিক্ষক এবং পূর্ণাঙ্গ মাওলানা। তবে আমার কাছে শুরু থেকেই সে শুধু আতিকুল্লাহ’।

লেখাটি এতই জীবন্ত ও জান্নাতী স্বাদে  ভরপুর যে, প্রতিটি  হরফ শরীরের লোমকূপের সাথে মিশে যাচ্ছিলো! প্রতিটি বাক্যই অপার্থিব ও ধ্রুব সত্য মনে হচ্ছিলো পড়ার সময়। সফরনামায় যাদের নাম এসেছে সবাইকে মনে হচ্ছিলো দূর আকাশের ঝলমলে তারা। গুণে দেখলাম ‘আতিকুল্লাহ’ নামক মানুষটির আলোচনা এসেছে প্রায় তেরোবার; সফরনামায় স্থান পাওয়া অন্যদের চেয়ে বেশি আলোচিত নাম এবং বেশ মায়াবি মনোজ্ঞ বিবরণে। একজায়গায় লিখেছেনÑ ‘মাঝেমাঝে ছেলেটা একদম ভালো মানুষের মতো কথা বলে, আর তখন তাকে ভালোবাসতে ইচ্ছা করে। অবশ্য আমার ভালোবাসা তো সে পেয়েছে সেদিনই, যেদিন মাত্র প্রথম পরিচয়ের পর তাকে আব্বার খেদমতের জন্য রেখে আমি আল্লাহর ঘরে গিয়েছিলাম। আব্বার জীবনের শেষ ইতিকাফে অন্তর দিয়ে সে আব্বার খেদমত করেছে, আর সফর থেকে ফিরে আসার পর আব্বা বলেছিলেনÑ আমার খেদমতের জন্য তুমি একজন ফেরেশতা রেখে গিয়েছিলে!’

সফরনামার শুরু থেকেই তো লেখক দিল কেড়ে নিয়েছেন। এরপর যখন প্যারায় প্যারায় একজন মানুষের ব্যাপারে এধরণের মুগ্ধমূর্তির চিত্রায়ন করে চলেছেন তখন কৌতূহলী মনের কোণে একটি  প্রশ্নবোধক (?) চিহ্ন গেঁথে গেলো; সাগর-তীরে যেমন জাহাজের নোঙর গেঁথে যায়। আর চোখের কোণে এসে বিঁধে রইলো একটি বিস্ময়বোধক (!) চিহ্ন; যেমন কাঁথার ভাঁজে সুঁইয়ের মাথা বিঁধে থাকে। ‘কে এই…?’ এবং ‘কে এই…!’  কিংবা দুটো চিহ্ন একসাথেÑ ‘কে এই…?!’

 

দুই.

প্রায় আট বছর পর ফেসবুকের নতুন স্বর্গরাজ্যে বিকেলের সূর্যালোক দেখতে আসি। সম্ভবত ২০১৩ সালের মাঝামাঝি এক বিকেলে নিউজফিড স্ক্রল করতে গিয়ে দেখি একজন মানুষের  অনেকগুলো ভেসে ভেসে উঠছে। প্রতিটা পোস্ট থেকেই সুষ্পষ্ট প্রতিভাত হচ্ছেÑ নিশ্চয় অনেক উঁচা মাপের কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির দক্ষ হাতের জিয়ন ছোঁয়ায় পুষ্ট এ সব; যার জ্ঞানের পরিধি অবাধ-অগাধ, গভীর ও সুবিশাল। ধর্মীয় জ্ঞানে যেমন পারদর্শী তেমনি জাগতিক জ্ঞানেও পারঙ্গম। ইলম ও জ্ঞানের সমুদ্রে তিনি বিপুল পাণ্ডিত্যের অধীকারী। গ্রন্থগত বিদ্যার পাশাপাশি বাস্তবিক অভিজ্ঞতাও আছে তার। নিয়মিতই পোস্ট দিচ্ছেন। কিছুদিন পর খেয়াল করলাম, মানুষটা অন্যসব ফেসবুকারের মতো এখানে সময় কাটাতে আসেন না। নির্দিষ্ট লক্ষ অনুযায়ী সময় মতো রুটিন করে ফেসবুকে আসেন। অনবরত পোস্ট করেই যাচ্ছেন। কেউ লাইক কমেন্ট করুক বা না  করুক। তিনি  নিজের গতিতে নিজের মতো করে লিখে যাচ্ছেন।  অনেকটাই যেনো ‘আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনান্দ’। কেউ পড়ুক বা না পড়ুক, দিনে বিশটার বেশি পোস্ট দিচ্ছেন।  কেউ লাইক কমেন্ট করছে কি করছে না, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই!

এত গুরুত্বপূর্ণ সব পোস্ট লিখে যাচ্ছেন, কিন্তু তেমন কেউ পড়ছে না! তিনিও কারো না পড়ার কোনো পরোয়া করছেন না! অবচেতনভাবেই মানুষটার প্রতি একটা প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধ গড়ে উঠলো। ফেসবুকে একজন ভালো ফ্রেন্ড ও আপন ভাইয়ের মতো করে নিলাম। নিয়মিত লাইক কমেন্ট বিনিময় চলতে থাকলো।

একদিন সকালে ফেসবুক লগিন করে দেখি নিউজফিডে মানুষটির একটি পোস্ট ভাসছে, ‘দরবারে দরবারে’ শিরোনামের একটি সিরিজ রচনা। পড়তে শুরু করেই চমকে উঠলামÑ ‘মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ এর সাথে রিকশায় চড়ে বার্ডেম  হাসপাতালে যাচ্ছেন’। বেশ ঝরঝরে অনবদ্য রচনা। রিকশায় বসা দুজনের মাঝে যে হৃদ্যিক বন্ধন আছে পোস্টের ভাষায় তা বোঝা যাচ্ছে। হঠাৎ ‘এখনো জোনাকি জ্বলে’Ñএ পড়া সেই ফেরেশতার কথা মনে হলো। মনের কোণে গেঁথে থাকা ‘?’ চিহ্ন ও চোখের কোনে বিঁধে থাকা ‘!’ চিহ্ন দুটো নড়ে উঠলো; যেনো আট বছর ধরে ঘুমিয়ে থাকা দুটো পাখি আড়মোড়া ভেঙেচূড়ে জেগে উঠলো! জেগে উঠলো বহু শতাব্দির ঘুমের পাড়া। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে কৈশরের সেই অনুভূতিগুলো কাঁঠাল-পাতার মতো তিরতির করে কাঁপতে শুরু করলো। শরীরের শিরায়-উপশিরায় ঝড়ের মতো শিহরণ ছুটে গেলো। বিদ্যুৎ গতিতে আশপাশে খোঁজখবর নিতে শুরু করলাম। আমার ধারণা ছিলো, যে মানুষ ঘড়ির কাঁটায় তাল মিলিয়ে চলে এ ধরণের কেউ ফেসবুকে আসতে পারে না। তার। আইডি ঘেঁটেও তেমন কোনো তথ্য পেলাম না!

তবে অল্প সময়েই যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ সব হিসাব মিলে গেলো। মুহতারাম শাইখ আবু তাহের মিসবাহ-এর ‘ফেরেশতা আতিকুল্লাহ’ আর ফেসবুকের এই জিন-লেখক ‘অঃরশ টষষধয’ এক ও অভিন্ন ব্যক্তি। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত অতলস্পর্শী জ্ঞানসমৃদ্ধ পোস্টের পর পোস্ট দিয়ে যাওয়ার কারণে মানুষটাকে জিন মনে হতো। সারা শরীর জুড়ে ঝিরঝির করে একটা ভয়কম্পিত শিহরণ ও ঠাণ্ডা সমীরণ বয়ে  গেলো। এতদিন ফেসবুক আড্ডায় শিক্ষকতূল্য শ্রদ্ধেয় মানুষটাকে ‘ভাই’ সম্বোধন করতাম! চিনতে বিলম্ব হওয়ায় মনে মনে নিজেকে তিরস্কার করলাম এবং আগের চেয়ে সতর্ক হওয়ার চেষ্টা করলাম। তিনি আমার শিক্ষকতুল্য। অল্পের জন্য তার ছাত্র হওয়া ললাটে  জুটেনি। তিনি যে বছর পড়াশোনা  সমাপ্ত করে শিক্ষক হয়েছেন আমি তার পরের বছর সবে শৈশব পেরিয়ে কিতাবখানায় পা রেখেছি।

 

তিন.

১৯৭৯ সালের ২৪ জুলাই পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়িতে জন্মগ্রহণকারী একজন বিরলপ্রজ প্রতিভাপুরুষ মাওলানা আতিকুল্লাহ। বাবা পানছড়ি সরকারি কলেজের শিক্ষক জনাব আবু তাহের দ্বীনদার সজ্জন। তিন ভাই তিন বোনের চতুর্থ তিনি। মাদরাসা শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা অর্জন করেছেন মাধ্যমিক শেষ করে স্নাতক পর্যন্ত। হিফজুল কুরআন সম্পন্ন করেছেন শৈশবেই। তারপর পাটিয়া মাদরাসায় ২০০৩ সালে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করে মাদরাসাতুল মদিনায় শিক্ষকতা করেছেন ২০০৭ সাল পর্যন্ত চার বছর। আরবি, ইংরেজি, বাংলা, উর্দু, ফারসি প্রভৃতি ভাষা ও সাহিত্যে সমান পাণ্ডিত্যের অধিকারী ধীমান এ আলেমে  দ্বীন কোরআন গবেষক ও লেখক হিসেবে বিপুল সমাদৃতি লাভ করেছেন। বাংলা, আরবি, ইংরেজি ও উর্দু  ভাষায় ৩০ টির মতো মাদরাসা-পাঠ্যপুস্তক প্রণোয়ন করেছেন তিনি। এছাড়াও ইতিহাস, উপন্যাস, গল্প ও প্রবন্ধের ২০টির মতো বাংলা গ্রন্থ বাংলাভাষী পাঠক সমাজে বেশ সমাদর লাভ করেছে। গত ৬-১০-২০১৯ ইং রোজ শুক্রবার থেকে তিনি আকস্মিক নিখোঁজ হন এবং প্রায় দেড় বছর কাটান বন্দিজীবন। দাম্পত্যজীবনে তিনি তিন কন্য ও এক পুত্রের জনক।

যে সব বিভূতি-ভূষণের কারণে মাওলানা আতিকুল্লাহর ব্যক্তিত্ব গেঁথে রইলো হৃদয়ের ভেতরÑ

১. শাইখ কোরআন খুব ভালোবাসেন। সে ভালোবাসা অর্জন ও বিতরণের সর্বাত্মক মোজাহাদা করছেন সর্বত্র। কোরআনের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য, তারকিব, বালাগাত, উর্দু ফারসি ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদ সবই যেনো নখদর্পণে। বাগধারা হিসেবে কোরআনের আয়াতের অপূর্ব ব্যবহার ও চাতুর্য দেখে দারুণভাবে আলোড়িত হয়েছি। উচ্চতর কোরআন শিক্ষার জন্য তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনন্য একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছেন। কোরআনের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। কোরআনের উপর শাইখের যে পরিমাণ  দখল তা আমার জানামতে বাংলাদেশে বিরল ও দুর্লভ।

২. তিনি একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। এ যুগে সাধারণ মুসলমান যেমন। মসজিদকে সপ্তাহে একদিন ঢুঁ মারার স্থান ও নামাজকে খতিবের সাথে অঙ্গসঞ্চালনের জিনিস বানিয়েছে তেমনি খাওয়াস মুসলমানও (উলামা-ত্বলাবা) খানকাহকে বছরে একদিন ঢুঁ মারার স্থান ও তাসাউফকে বুজুর্গের  সাথে মোসাফাহা করার জিনিস বানিয়েছে। কিন্তু শাইখ ব্যতিক্রম। সপ্তাহে দুইদিন নিজ মুরশিদের দরবারে না গেলেই নয়।

৩. মানুষের ভাষাশক্তি জাদুর মতো কাজ। আল্লাহ শাইখকে এ যাদু অনেকের চেয়েই  বেশি দিয়েছেন। অসংখ্য উর্দু- ফারসি কবিতা শুধু মুখস্ত-ই না, কণ্ঠস্থ ও হাতস্থ। একটি আরবি ইভেন্ট করে লক্ষাধিক আরবকে চমকে দিয়েছেন। আরবরা বিস্মিত হয়ে জেনেছে যে, পৃথিবীতে বাংলাদেশ নামক একটি ক্ষুদ্র আজনবি দেশ আছে, এবং  সে দেশের মানুষও বিশুদ্ধ আরবী জানে। বাংলাদেশের শীর্ষ  ইংরেজি প্রতিষ্ঠান বিদগ্ধ ইংরেজিয়ানরা এখনো ক্লাসে ছাত্রদেরকে,  উদাহরণ দিতে গিয়ে গর্বভরে এই একজন মাওলানার কথা বলেন। ইংরেজি শিখতে হলে এমন শিখতে হয়।

৪. ফেসবুকে  সবাই সাধারণত ইস্যুভিত্তিক  পোস্ট দেয়। আজকে কোথায় ঘুরতে যাওয়া হচ্ছে। মাদরাসায় বিশেষ কোনো মেহমান এসেছেন বা মাহফিল হবে। ভালো লাগছে না, মন খারাপ। আজকে বিশেষ কোনো ঘটনা ঘটলো। কিন্তু শাইখ এক্ষেত্রে অন্য সবার থেকে আলাদা। রুটিন করে নির্দিষ্ট শিরোনাম কায়েম করে অবিরাম লিখে যাচ্ছেন। একটা লাইক পড়লে যেমন লিখছেন একশত লাইক পড়লে তেমনই লিখছেন। যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে, তুই একলা চল। দুই বছর আগে যেমন লিখেছেন এখনও তেমনই লিখে চলেছেন।

৫. আমাদের বাস্তব জগতের মতো এটাও একটা জগত। ভার্চুয়াল জগত। বাস্তব জগত থেকে ভার্চুয়াল জগতকে পৃথক করার কোনো সুযোগ নেই। অনেকের কাছেই ভার্চুয়ালের এই অন্তর্জগত ‘জাস্ট  ফোর ফান’ বা ‘শুধু সামাজিক যোগাযোগ’এর মাধ্যম হিসেবেই পছন্দনীয়। কিছু মানুষ এ সুযোগে তাদের মতাদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার বাতিঘর বানিয়ে নিয়েছে।

বাঁধভাঙা স্রোতের মতো আসতে থাকা তালিবুল ইলমরাও অনেকেই সে  আলোকধাঁধায় গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। এমন সময় এখানে শাইখ আলোর মিনার হয়ে আবির্ভূত হলেন। বাস্তব জগতের মতোই এখানেও মাদরাসার নূরানি বলয় গড়ে তুলেছেন আন্তরিক প্রচেষ্টায়। তিনি ভার্চুয়ালে কিছু মানুষের প্রত্যক্ষ ও অসংখ্য মানুষের পরক্ষ শিক্ষক হিসেবে ঋদ্ধ করেছেন। লেখার বিষয়, স্টাইল, বিন্যাস ইত্যাদি অনেক কিছুই তিনি প্রবর্তন করেছেন। অজান্তেই আমরা অনেকে সে পথে হাঁটতে শিখেছি। এখানে তার সাফল্যের কারণ হলো, মুরুব্বির মশওয়ারা ও রাহনুমা অনুযায়ী এখানে অনলাইনে মেহনত শুরু করেছেন। একটি নতুন পৃথিবী বিনির্মাণ করেছেন। বিশুষ্ক মরু সাহারায় গড়ে তুলেছেন সুরম্য সুফলা মরূদ্যান। জীবন্ত মরুভাস্কর একজন!

 

ছয়.

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির এক তারিখ। দুপুরের রোদ নরম হয়ে এসেছে প্রায়। অনেক্ষণ হয়ে গেছে বাংলা একাডেমীর সামনে আইল্যান্ড ধরে দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে আছে আরো শত শত মানুষ। প্রাণের বইমেলার পয়লা পার্বণে গোধূলিতে পা রাঙাতে ব্যাকুল প্রতীক্ষা। টিএসসি চত্বর থেকে বাংলা একাডেমী ও সোহরাওয়ার্দি উদ্যান পর্যন্ত জনসমুদ্র মুখরিত প্লাবিত কল্লোলিত। তিনটার সময় মেলা উন্মুক্ত হওয়ার কথা। এখনো ভিতরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনী ভাষণ দিচ্ছেন। এদিকে আসরের সময় চলে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। দুকদম এগুতেই  চোখে পড়লো বিপরীত দিক থেকে বিপরীত লেন দিয়ে দুইজন মানুষ এগিয়ে আসছে, লেফটরাইট ভঙ্গিতে দ্রুত পদক্ষেপে। একজন আজানুলম্বিত সাদা জুব্বা পরিহিত। মাথায় কালো-সাদা রুমাল পেঁচানো। কাঁধে কাশ্মীরী নকশার সবুজ জাম্বিল ঝোলানো। শান্ত সৌম্য মূর্তি। পাশের জন হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলে চলেছে। পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যেতেই খচ করে বুকের ভেতরটা নড়েচড়ে উঠলো। ভিতর থেকে যেনো কেউ আওয়াজ করে বললোÑ এই তো ইনি-ই…!  আর সাথে…! দুজন মানুষকেই কেমন যেনো চিনে ফেললাম।

নামাজ শেষ করে এসে দেখি জনস্রোত আরো বেড়েছে এবং বেড়েই চলেছে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর  বেরিয়ে গেলো এবং মেলা খোলা হলো। প্রথমে বাংলা একাডেমি অংশে প্রবেশ করলাম। দ্রুত পায়ে একাডেমির শেষ সীমানায় নতুন ভবন পর্যন্ত গেলাম। নাহ, মানুষ দুটো এদিকে আসেনি, সোহরাওয়ার্দি উদ্যানেই প্রবেশ করেছে সম্ভবত। এবার সেদিকেই ছুট  লাগিয়ে দিলাম। কিছুদূর এগিয়ে একাডেমির আগের ভবনের কাছাকাছি আসতেই দেখি মানুষ দুটো বিপরীত দিক থেকে আসছে।

আগেই প্ল্যান এঁটেছিলাম যে, আমার কাঙ্খিত ব্যক্তি হোক বা না হোক কাছে যাবো সালাম দিবো এবং পরিচিত হবো। স্ত্রস্ত পায়ে কাছে এগিয়ে যেতেই মানুষটি আগ বাড়িয়ে সালাম দিয়ে বলে উঠলেনÑ

– আরিফ খান…?

– জী, …

– আমি আতিকুল্লাহ!

– জি, চিনতে পেরেছি।

মোসাফাহা করতে গিয়ে ঘোরের ভিতর হারিয়ে গেলাম; আমি তো তাকে চিনতে পেরেছি কিছু আলামত দেখে কিন্তু তিনি…?

মাগরিবের পর সেহরাওয়ার্দি উদ্যান চত্বরে বেশ রসালো ও প্রাণোচ্ছল আড্ডা হলো। আমি হিমালয়সম মানুষটাকে নিকট থেকে অপলক শুধু অনুভব করার চেষ্টা করছি। বহুদিনের বহু চেষ্টা বহু প্ল্যান বহু পরিকল্পনা দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও অনেক প্রস্তুতি  প্রত্যাশার ফল আজকের এই শুভ মোলাকাত। ইংরেজি সাহিত্য উর্দু সাহিত্য বাংলা সাহিত্য আরবি সাহিত্যÑ কোনটা তার পড়া হয় নি?! এত শত বিষয়ের রস ও নির্যাস নিংড়ে ছেঁকে সব মগজে পুরে  রেখেছেন যেনো। এতো উঁচু মাপের বিদগ্ধ পণ্ডিত ভাষাজ্ঞ ইতিহাসবেত্তা বিশ্লেষক, অথচ আকৃতি অবয়বে আমাদের মতোই একজন মানুষ!

শাইখের পড়াশোনার পরিধি অতলস্পর্শ কিংবা আকাশছোঁয়া। সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি ইত্যাদি বিষয়ে অগাধ জ্ঞানই নয় শুধু; রয়েছে প্রতিটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞের দখল, প্রবীণের পাণ্ডিত্য, জাদুকরের শক্তি ও যুবরাজের অধিকার। অথচ এই অসাধারণ মানুষটি সীরাতে-সুরাতে কী সাধারণ! সমাজের হাজারো মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার মতোই সাধারণ। বয়সে উদীয়মান, অথচ জাতীয় মানের প্রতিষ্ঠানের কাজ আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন একা, নিজ পদক্ষেপে নিজ  প্রচেষ্টায়। বাংলাদেশে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষার গঠনমূলক নবায়নমূলক ও গবেষণামূলক অবদান রেখে চলেছেন। বাহ্যিক আত্মিক ও আধ্যাত্মিক সব  ক্ষেত্রে একজন বিরলপ্রজ মণীষাপুরুষ। যার হিরণ¥য় দ্যুতি ও দ্যোতনায় আমরা ঋদ্ধ আমরা আকণ্ঠ সমৃদ্ধ।

বাংলা একাডেমী নতুন ভবনের পিছনে ঝিলের সামনে খাবারের রেস্তোরাঁ বানানো হয়েছে সুপরিসর জায়গাজুড়ে। মায়াময় আলো-আঁধারিতে বেশ মনোরম পরিবেশ রচনা করা হয়েছে। সাঁঝের মায়া যেন! সামনে ঝিলের জলস্রোতে ল্যাম্পপোস্টের আলো-ছায়া পড়ে পানি সুন্দর টলটল করছে। নারকেলগাছগুলোর পাতার ফাঁক দিয়ে রাতের আকাশে মেঘ ভাসছে। তাঁবুর বাইরেও  খোলা আকাশের নীচে টেবিল-চেয়ার বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভিতরে  প্রবেশ করেও কী মনে করে  শাইখ বাইরেই বসতে পছন্দ করলেন। আমারও এটাই পছন্দ হলো। খোলা আকাশের নীচে ঝিরিঝিরি বাতাস; ঝিলের ঝিলমিলে জলস্রোত দেখা যায়। এখানে একটি আলোর হাট বসলো। শায়খের সঙ্গে দধিচিনি জলখাবারের সঙ্গে ঘণ্টাখানেক সময় পেরিয়ে গেলো। এখানে এই প্রথম শায়খের মহানুভবতা ও মহামানবতা দেখেছি একান্ত অনুভবে। এখনো জোনাকি জ্বলে বুকের ভেতর! এখনো জোনাকি জ¦লে স্মৃতির মিনার জুড়ে!

 

পরবর্তী অংশ পড়ুন : হরফে হরফে জ্বলে জোনাকির আলো (২)