ভ্রমণ

মেঘালয়ে মেঘের নীলে-২

চার.

রাতারগুল থেকে সন্ধ্যারাতের আঁধারে আঁধারে বের হয়ে এলাম তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো। শাহ জালাল রহ.-এর দরগাহের কাছাকাছি আসতেই চোখে জ্বলে উঠলো দরগাহ রোডের আলো ঝলমল রাজকীয় জৌলুশ। পুরো সিলেট নগরীর সমস্ত কোলাহল যেনো এই দরগাহ ঘিরে। আলোবর্ণিল সড়কের দুপাশে সারি সারি তিলোত্তমা সব হোটেল রেস্তোরাঁ শপিং মল ও মানুষের ঢল। দরগাহের শাহী গেট দিয়ে ঢুকতেই গাম্ভীর্যপূর্ণ সমাগম চোখে পড়ে। নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ সর্বশ্রেণীর মানুষের পদভারে মুখরিত। এখানে সেখানে এলোমেলো চুলের বাউল ফকির বিচিত্র বেশে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। ডান দিকে জালালি কবুতরের আস্তানা রেখে মাজারের মূল ভবনে উঠে যাই। জুতা নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। টিলার উপর নির্মিত সুরম্য মাজারের মূল অংশে প্রবেশ করে দেখি ভয়াবহ অবস্থা। কবর ঘিরে নামাজ, সেজদা, কেয়াম, তেলাওয়াত, মোরাকাবা, জিকির এমনকি তাওয়াফও করা হচ্ছে। এটা বিখ্যাত দরবেশ আলেম শাহ জালাল মুজাররাদ (১২৭১-১৩৪১ খৃ.) ইবনে মাহমুদ ইবনে ইবরাহিম কুরাইশি রহ.-এর কবর। তুরস্কে জন্মগ্রহণকারী ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত এই মহান বুজুর্গ ১৩০৩ সালে ৩২ বছর বয়সে ভারতবর্ষ থেকে সিলেটে আগমন করেন। সাথে ছিলেন ৩৬০ জন দরবেশ ও শিষ্য। কিশোর বয়সে শাহ জালাল রহ. স্বপ্নে দেখেন ভারতবর্ষে ইসলামের পতাকা উচ্চকিত করছেন। তখন তিনি মক্কায় মামা ও মুরশিদ সোহরাওয়ার্দি তরিকার শায়খ আহমাদ কবির রহ.-এর সান্নিধ্যে ইলম ও তাসাউফের দীক্ষা নিচ্ছেন। স্বপ্ন শুনে তিনি ভারতবর্ষে সফরের নির্দেশ দেন। সাথে এক মুঠো মাটি দিয়ে বলেন যে স্থানের মাটির সাথে এর ‘বর্ণ-গন্ধ-স্বাদ’ মিলবে সেখানে অবস্থান করবে।

ভারতবর্ষে আগমণের পর বাংলার শাসক শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহের নিকট সাক্ষাৎ হয় গাজি শেখ বুরহানুদ্দীনের সাথে। সিলেটের অধিবাসী গাজি বুরহানুদ্দীন নবজাতক সন্তানের আকিকা উপলক্ষে গরু কোরবানি করেন। এতে অসহিষ্ণু হিন্দু শাসক গৌড় গোবিন্দ শিশু পুত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করেন এবং তার ডান হাতের কব্জি কেটে দেন। গাজি বুরহানুদ্দীন ফিরোজ শাহের দরবারে যান বিচারের আশায়। অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে ফিরোজ শাহ বিশাল সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। মুসলিম সেনাবাহিনী গৌড় রাজ্যের সীমান্তবর্তী ব্রহ্মপুত্র নদী পার হতে গেলে গৌড় গোবিন্দ জাদু ও অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করে মুসলিমদের বিপর্যস্ত করে দেন। বাদশাহ এ সংবাদে আশাহত হন। এ ঘটনার পর শাহ জালাল রহ. তার সঙ্গীদের নিয়ে ব্রাহ্মপুত্র নদী পার হয়ে যান। এখানেও গৌড়ের সীমান্ত রক্ষীরা অগ্নিবাণ পয়োগ করে প্রতিহত করতে চেষ্টা করে। কিন্তু কোনো ক্ষতি করতে পারে নি। এভাবে সুরমা নদীও পার হয়ে যান। বিষয়টি গৌড় গোবিন্দ গুরুত্বের সাথে নেন এবং বরাক নদীতে নৌকা চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। শাহ জালাল রহ. পূর্বের মতো সাথীদের নিয়ে জায় নামাজের সাহায্যে বরাক নদী পার হন। গৌড় গোবিন্দ যখন দেখলেন সব শক্তিই বিফল হচ্ছে তখন শেষ চেষ্টা হিসেবে যাদুমন্ত্রসহ এক প্রকাণ্ড লৌহধনুক প্রেরণ করেন শাহ জালাল রহ.-এর কাছে। ধনুকের ভেতর মন্ত্র ছিলো, কেউ এই ধনুকের জাল ছিঁড়তে পারলে গোবিন্দ বুঝে যাবেন সব রকম জাদুশক্তি এখন নিষ্ফল। শাহ জালাল রহ. সবাইকে বললেন, জীবনে যার কোনো ফজর কাজা হয়নি শুধু সেই পারবে এই ধনুকের জাল ছিন্ন করতে। মুসলিম বাহিনীর ভেতর সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীনকে উপযুক্ত পাওয়া গেলো এবং তিনিই ধনুকের জাল ছিন্ন করলে। শাহ জালাল রহ. ও ৩৬০ আউলিয়ার কারামতি ও আলৌকিক বিভিন্ন ঘটনায় গোবিন্দ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গড়দুয়ারার রাজবাড়ি থেকে পালিয়ে পেচাগড়ের গুপ্তগিরি দুর্গে আশ্রয় নেন। এরপর গৌড় গোবিন্দের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি।

শাহ জালাল রহ. এই টিলার নিকট এসে শায়খের দেয়া মাটির সাথে মিল পাওয়ায় এখানে অবস্থান গ্রহণ করেন এবং পুরো অঞ্চলে বয়ে দেন ইসলামের শান্তিময় সুবাতাস। শাহ জালাল রহ.-এর বিভিন্ন কারামত ও অপূর্ব আদর্শে মোহিত হয়ে দলে দলে হিন্দুরা ইসলাম গ্রহণ করেন ও মুসলিম শাসক থেকে সর্বসাধারণ পর্যন্ত সর্বস্তরে গড়ে ওঠে অগাধ ভক্তি ও গৌরববোধ। তার অবস্থানস্থল ও কবর ঘিরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে মসজিদ মাদরাসা মুসাফিরখানা পুকুর চিকিৎসালয় জাদুঘর জায়গিরখানা ও নানা স্থাপনা। বাংলার সুলতানগণ এতে সংস্কার ও নতুন কিছু নির্মাণে গৌরববোধ করেন। মোঘল শাসকগণ দরগাহের আলোক-সজ্জা, অনুদান, মাহফিল ইত্যাদি করেন। দিল্লীর রাজপুরুষগণ সিলেটের শাসনকর্তা নিযুক্ত হলে প্রথা অনুযায়ী শাসনভার গ্রহণের পূর্বে দরগাহে এসে জিয়ারত সম্পন্ন করে দরগাহের স্থলাভিষিক্ত খাদেমগণের স্বীকৃতি নিয়েই দায়িত্বপ্রাপ্ত হতেন। রাজপুরুষগণ রাজকীয় আড়ম্বরে দরগায় এসে পৌছার পর খানকার শেখ তাদের মাথায় পাগড়ি বেঁধে অনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রতি শাহ জালালের মনোয়ন জ্ঞাপন না করা পর্যন্ত জনসাধারণ তাদেরকে শাসনকর্তা হিসেবে গ্রহণ করতো না। এতে করে যুগ পরম্পরায় মানুষের মাঝে চলে আসে এই মাজারকেন্দ্রিক বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান। এমনকি ভক্তির আতিশয্যে রীতিমতো নতুন ইবাদতের রূপ নিয়েছে এসব। মাজারের ভেতরে বাইরে মানুষ মান্নত করে বৃষ্টির মতো টাকা বর্ষণ করছে, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করছে, তালাবন্ধ করছে, গোলাপজল ছিটিয়ে দিচ্ছে, সেজদা করছে। কয়েকজন আমাকেও অনুরোধ করেছে তাদের গোলাপজল ছিটিয়ে দেয়ার জন্যে। মহান বুজুর্গের কবরের এক পাশে দাঁড়িয়ে আমরা সালাম দিয়ে কিছু হৃদয়জ হাদিয়া পেশ করি; আগরবাতি ও গোলাপজলের সুবাসে মোহিত ভাবগম্ভীর পরিবেশে।

মূল মাজার থেকে বের হয়ে পাশের উপরের টিলায় গাছে ছায়ায় ছায়ায় অসংখ্য কবর। সিলেটের বিখ্যাত প্রায় সবার কবর এখানে। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল উসমানির কবরও এখানে। মাজারের সাথেই মসজিদে ইশার নামাজ আদায় করি। মসজিদ মাজারের অন্তর্ভুক্ত হলেও ইমামতির দায়িত্বে নিয়োজিত দরগাহ মাদরাসার আলেম। দরগাহ মাদরাসার অফিসে কথা হলো প্রবীণ কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে। তারাও বেশ আফসোস প্রকাশ করলেন কিন্তু মাদরাসা পরিচালনা ও পড়াশোনা কওমি আলেমদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় কিছুটা স্বস্তি বিদ্যমান। দরগাহের স্মৃতি মাথায় নিয়ে পায়ে হাঁটা দূরত্বে আম্বরখানা শাহী মসজিদে আসি। মেইনরোডের পাশেই বেশ আড়ম্বরপূর্ণ আম্বরখানা মসজিদ। এ মসজিদের সম্মানিত খতিব মুফতি জিয়া রহমান ভাই বেশ আধুনিকমনা একজন আলেম। তরুণদের নিয়ে সামাজিক মিডিয়ায় ও নিজস্ব বলয়ে ইসলাম বিস্তারের কাজ করে যাচ্ছেন নব নব চিন্তায়। জিয়া ভাইয়ের হুজরা প্রাঙ্গণে রাতের দস্তরখানা বিছানো হলো এবং ভালোবাসা মিশিয়ে বিন্যাস করা খাবারের ঐশ্বর্যে পেট ভরে বুকের ভেতরেও স্পর্শ করে গেলো। বেশ রাত হলো গল্পে আলাপে আড্ডায় মুখরিত আনন্দে এবং সিলেট নগরীর রাজপথে কোলাহল কমে এলে নিয়নলাইটের আলোয় আইল্যান্ড ধরে গল্পে গল্পে হেঁটে যাই আমরা। কত বিচিত্র এই পৃথিবী! কত বিচিত্র পৃথিবীর জনপদগুলো! কত বিচিত্র এইসব মানুষ ও মানস! এবং কত প্রাণোচ্ছল এই রাতের ঝিরিঝিরি বাতাস ও উচ্ছ্বাস!

 

পাঁচ.

সকালের আলোয় আলোয় বেরিয়ে যাই আমাদের এবারের আকর্ষণ জাফলং তামাবিলের পথে। পিয়াইন নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এই সীমান্তকে বলা হয় প্রকৃতির কন্যা। এখানে এক পাশে আকাশছোঁয়া মেঘালয় পর্বতমালা অপরপাশে ভারতের ডাওকি পার্বত্য অঞ্চল। জাফলং-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের পর্যটকরা একই জায়গায় একসাথে নিসর্গশোভা উপভোগ করে। জাফলং নেমে তামাবিলের তীর ধরে হেঁটে যাই আমরা। বাম দিকে বিলে রংবেরঙের নৌকা নিয়ে লোকজন বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে, পাথর বোঝাই ট্রলার ক্ষুণ্ন করছে প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং নরম বেলাভূমির উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পায়ে পায়ে জাগে আশ্চর্য শিহরণ; তামাবিলের ঢেউ এসে পা ভিজিয়ে দিয়ে যায় একটু পরপর। এপারের উপজাতি মণিপুরিদের শ্রীরামপুর গ্রাম বেষ্টিত জৈন্ত পাহাড়ের ছোট ছোট টিলার উপর নীচ দিয়ে হেঁটে যাই আর অদূরে, এইতো চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে ভারতের মেঘালয় পাহাড়শ্রেণী হাতছানি দিয়ে ডাকে আমাদের। আকাশছোঁয়া পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে নির্মিত সড়কে ও ডাওকি ব্রিজে ছুটে চলা গাড়ি সবুজের ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। পুরো পাহাড় জুড়ে রোদে ঝলমল করছে বর্ণিল বাড়িগুলো। আর কানের কাছে কলকল সুর তুলে বয়ে যাচ্ছে পাথর গলা সহস্র ঝরনার ঝারা। জৈন্ত পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নীচে নামতেই সামনে জিরো পয়েন্ট। দূরে অদূরে অনেক দূর পর্যন্ত বেলাভূমিতে বিস্তৃত অনেক মানুষের কোলাহল। হিমালয় থেকে ছুটে আসা ঝরনাধারা এই মেঘালয় ও ডাওকি পাহাড়ের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে পিয়াইন নদীর রূপ নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে এবং এটাকেই আমরা বলি তামাবিল আর এ নদীকে স্থানীয় উপজাতিরা বলে মারি নদী। সম্মোহন জাগানো জলধারার অপূর্ব সম্মিলন চারিদিকে।

বৈচিত্র্যময় নিসর্গশোভার সন্নিবেশ ঘটেছে এখানে এই মায়ালোকে। জাফলং জিরো পয়েন্টে ছড়িয়ে আছে অন্যরকম অপার্থিব সুখ-তৃপ্তি। একপাশে যেমন ভারতীয়রা তাদের সীমানা সৌন্দর্য উপভোগ করছেন অন্যদিকে বাংলাদেশীরাও সীমানা-সুখে বিভোর। এ যেনো সীমানা আমাদের দুভাগে ভাগ করলেও আনন্দ আর উপভোগে নেই বাধা, সীমা-পরিসীমা। উপরে একটি টিলায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষীরা একই চৌকিতে পাহারা দিচ্ছে। আর নীচে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপে বহমান জলস্রোতে পা ভিজিয়ে হেঁটে যাই আমরা। হেঁটে হেঁটে সীমান্তের ওপারে খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে চলে যাই। পাহাড় থেকে ছুটে আসা জলপ্রপাত, অদূরে ভারতের ঝুলন্ত ডাউকি ব্রীজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেল পানি, আকাশছোঁয়া মেঘালয় পাহাড়ের গহীন অরণ্য ও সুনশান নীরবতার ভেতর অন্য এক পৃথিবীতে প্রবেশ করি। চারিদিকে প্রকৃতির কী অফুরান অনুদান! পাথরগুলো সব পানির স্রোতের নীচে। স্রোত ক্রমেই বেগবান হচ্ছে। হাঁটতে পা আটকে আসছে। একটি উঁচা শিলাখণ্ডে ব্যাগ রেখে বসে পড়ি। পা ভিজিয়ে বয়ে যাচ্ছে পিয়াইন নদী ও তামাবিলের মিশ্র জলধারা। এই পাথুরিয়া স্রোতেলা জায়গায় হেঁটে হেঁটে ভারতের একজন ঝালমুড়ি বিক্রি করছে। বেচারার অনেক দুঃখকথা শোনালো। গরিব মুসলমান। থাকেন শিলং-এর একটি গ্রামে। আমরা পাঁচজন তার প্রতি সহমর্মী হয়েই বেশি করে ঝালমুড়ি নেই। এই মায়াবী প্রকৃতির মাঝে ঝালমুড়ি খাওয়া যেনো মুগ্ধতায় বিঘ্ন ঘটানো। তবুও ভালো লাগছিলো একজন অসহায় মুসলিমকে কিছু সঙ্গ দিতে পেরেছি ভেবে। জামাকাপড় বদলে বড় একটি পাথরের উপর রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ি পিয়াইন নদীর শীতল জলাশয়ে। নীচে কাঁটার মতো শ্যাওলা পড়া অজস্র পাথর। পা পিছলে পিছলে যায়। ঘোরের ভেতর কতক্ষণ সাঁতার কেটেছি জানি না, পানির স্তর যখন প্রবল গতিতে ফুলে উঠতে শুরু করলো ভয়ে মোহ ভেঙে উঠে পড়ি। জৈন্ত পাহাড়ের টিলা বেয়ে মনিপুরীদের গ্রামের ভেতর দিয়ে উঠে আসি। পেছনে পড়ে থাকে মায়াময় জাফলং-এর কিছু মুগ্ধ স্মৃতি।

 

ছয়.

চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গলে অতিবাহিত হয় অপূর্ব মনোরম রাত। ছিমছাম সাজানো শহরটি ঘুরে আসি রাতের বাতাসে। রেলস্টেশন ও সন্ধ্যা হোটেলের আশপাশে মানুষের সাদর ব্যবহার অভিভূত করলো। এখান থেকে সারা দেশে চায়ের বিপনন করা হয়। একটি চায়ের দোকানে বসি, দোকানের তরুণ কর্মকর্তা গাইডের কাজও করেন। পুরো শ্রীমঙ্গলের পর্যটন ম্যাপ তুলে ধরলেন আমাদের সামনে। খুব ভোরে ভোরে বেরিয়ে যাই দুইটি পাতা একটি কুড়ির রূপের খোঁজে। পাহাড়ি পথে আমাদের জন্য সিএনজি উপাদেয় বাহন। আজকে শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান, রাবার বাগান, চা-কোম্পানি ও কিছু অরণ্য পাহাড়ে ঘুরবো আমরা। পুরো শ্রীমঙ্গল জুড়েই বিস্তারিত চায়ের রাজ্য। ৩৮-টি চা বাগান আছে শ্রীমঙ্গলে। ছোট একটি চা-বাগানের জন্য প্রয়োজন কয়েক একর জমি কয়েকটি পাহাড়। শ্রীমঙ্গল জিরো পয়েন্ট থেকে রেলস্টেশনের পেছনের সড়ক ধরে ছুটে চললো আমাদের চা-পাতা বর্ণের বাহনটি। গহীন সবুজের ছায়ায় মোড়ানো লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পথ ধরে। দুপাশে সবুজ আর সবুজ। বাম দিকে হালকা বাঁক নিতেই লাউয়াছড়ার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিখ্যাত পাঁচ তারকা হোটেল গ্রান্ড সুলতান। ওয়ার্ল্ড লাক্সারি রিসোর্ট এওয়ার্ড প্রাপ্ত হোটেলটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সুন্দর ও বিলাসবহুল হোটেল। প্রায় দুই লক্ষ বর্গফুট জায়গা জুড়ে সাজানো এরিয়ার ভেতরে আছে পাহাড় বাগান লেক হ্যালিপ্যাড ও নান্দনিক আয়োজন। বাইরে দাঁড়িয়েও অবলোকন করা যায় এর অপূর্ব রূপশোভা।

শ্রীমঙ্গলের এই রাস্তা সবচেয়ে সুন্দর; পাহাড়ের উপরে নীচে ঢেউ খেলানো পিচপেষা মসৃণ পথ, কোনো জ্যাম নেই, গাড়িঘোড়া ও পথচারী নেই, দুপাশে গহীন সবুজের ছায়ার বিস্তার, পাহাড় বেয়ে থরে থরে সাজানো চা-বাগান, সমান মাপে ছাঁটা চা-শিশুগুলো বাতাসে দোল খেতে গিয়ে অনড় দাঁড়িয়ে আছে, ঢালু বেয়ে লাল নীল পাহাড়ি কন্যা কপাল থেকে পিটে টুকরি বেঁধে চা-পাতা ছিঁড়ে নিচ্ছে, অপূর্ব মায়াবিস্তারি রাস্তা এক। এই সুরম্য বনপথে বাতাসে বাতাসে উড়ে চলা অসহ্য আনন্দের। অন্য জাগতিক ঘোর তন্ময়তায় আচ্ছন্ন করে রাখে এই অনাবিল নিসর্গজ বনপথ। ড্রাইভারের কথায় সচকিত হয়ে তাকিয়ে দেখি ডান দিকে করুণ নিসর্গ-অশ্রুর দিকে। সৌন্দর্যের সুপ্ত লীলাভূমি এই শ্রীমঙ্গল অনেক খনিজ সম্পদের কারণে বিদেশীদের লোভের স্থান। মার্কিন অক্সিডেন্টাল কোম্পানি এই মাগুরছড়ায় গ্যাস কূপ খনন করতে গিয়ে ৮৫০ মিটার গভীরে ড্রিলিং প্রবেশ করানোমাত্র ব¬ান্ড আউট হয়ে বিকট শব্দে বিস্ফারণ ঘটে। কেঁপে ওঠে পুরো শ্রীমঙ্গল। ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন রাত ১:৪৫ মিনিটে ঘুমন্ত শহরবাসী ভয়াল চোখে তাকিয়ে দেখে ৫০০ ফুট উচ্চতায় দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা। টানা নয় দিন নয় রাত্র জ্বলতে থাকে এই সর্বগ্রাসী আগুন। আশপাশের প্রায় তিন চার একর জমি ও লাউয়াছড়া উদ্যান পুড়ে ভষ্মীভূত হয়। আশপাশের নিসর্গশোভা, বনাঞ্চল ও জীবজন্তুর ব্যাপক ক্ষতি হয়। এই অপূর্ব সড়ক ও রেলপথ বন্ধ থাকে দীর্ঘ ছয় মাস। প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা মূল্যের প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি হয় এতে। সেখানে এখনো জন্মে না কোনো সতেজ উদ্ভিদ। চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে পরিত্যক্ত ফেলে রাখা হয়েছে। এখনো আমরা দূর থেকে দেখি গাছের গায়ে গায়ে কালো কালো পোড়া দাগ। সৌন্দর্যের লীলাভূমিতে কান্নার অশ্রুজল।

 

সাত.

পথে কয়েকটি রাবার বাগান ও চা-বাগান দেখে মাধবপুর লেকের গেটে এসে দাঁড়াই। আমরা এসেছি সকাল আটটার দিকে। লেক খুলবে সকাল নয়টায়। ভেতরে সিকিউরিটি অফিসারের সাথে কথা বলে ভেতরে প্রবেশ করি। পিচ ঢালা পথে দুপাশের বৃক্ষছায়ায় কিছুক্ষণ হেঁটে বিমুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখি কী বিস্ময়! চারিদিকে আকাশছোঁয়া পাহাড়ের সবুজ ঢেউ। মাঝখান মায়াবতী মাধবপুর লেকটি; সত্যি অপূর্ব! পাহাড়ের সবুজ ছায়া পড়া লেকের ঝলমল জলে বেগুনি শাপলা ও নীল-শাদা পদ্ম এমনভাবে পাতা বিছিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বাস হতে চায় না যে এ প্রাকৃতিক, মনে হয় যেনো পাথরে নির্মিত মুঠো মুঠো ভাস্কর্যে রঙের প্রলেপ দেয়া হয়েছে। এত নিখুঁত ও নিটোল হতে পারে শাপলা ও পদ্ম! পুরো লেক জুড়ে অসংখ্য ভাসমান শালুক, ভাঁটফুল, শাপলা ও পদ্মের বৈচিত্র্যময় অনুপম শোভা; অপার্থিব শিহরণ ছড়িয়ে গেলো শরীরময়। অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকি এই অপূর্ব জলশোভার দিকে। চারপাশে কী মায়াবী ছায়া! লেকের উপর সুনীল আকাশের ছায়া ও পাহাড়ের সবুজ ছায়া হাতে হাত ধরে ঝাঁপিয়ে পড়লে বুঝি এমন স্বর্গীয় রূপ ধারণ করে! চারিদিকে জল-পাহাড়ের কী নেশাময় সবুজ-সোঁদা গন্ধবাহ মৌতাত! ইচ্ছে হয়, পৃথিবীর সব ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি এই অলৌকিক হ্রদের হৃৎপিণ্ডে! উপরে তাকিয়ে দেখি আরো কত সম্মোহনের হাতছানি। কয়েকজন উপরে উঠেও গেছে আমাদের। সিঁড়ি ভেঙে স্তরে স্তরে সাজানো চা-বাগানের ভেতর দিয়ে উপরে উঠে যাই আমিও। চায়ের চাষাবাদের স্বার্থেই প্রয়োজন প্রচুর পানি, এ প্রয়োজন পূরণ করতে ১৯৬৫ সালে এনটিসির কর্তৃপক্ষ তিনটি পাহাড়ের ভাঁজে কৃত্রিমভাবে গড়ে তুলেছেন এই মাধবপুর লেক; চা-শ্রমিকদের পরিভাষায় ডাম্প। এই ডাম্পের আয়তন প্রায় ৫০ একর এবং দৈর্ঘ্যে ৩ কিমি ও প্রস্থে ৫০ থেকে ৩০০ মিটার। পাহাড়ের যতই উপরে উঠি বিস্ময়ের পারদ বাড়তেই থাকে। কী সুন্দর মোহ মোহ সবুজ বাতাসের এলোমেলো ওড়াউড়ি চারপাশে! পাহাড়ের ভাঁজ ও সরু মেঠো পথে কয়েকটি বাঁক নিয়ে চূড়ায় গিয়ে দাঁড়াই। পুরো লেক ও পাহাড়-পল্লব এখন চোখের সামনে দৃশ্যমান। দশটি বাঁক নিয়ে পাহাড়ের সবুজ গা বেয়ে নেমে গেছে। ঝিরিঝিরি বাতাসে উড়ে আসছে চা-পাতা ও সবুজ গুল্মলতার গন্ধ। পুরো লেকের অবয়ব এক পাশে তিরতির করে দুলছে। শান্ত নীল সরোবরের ভেতর নীচ থেকে দেখা ফুলগুলো আরো অলৌকিক মহিমায় মায়াবী রূপ বিস্তার করেছে এবং সাঁতরে বেড়াচ্ছে পানকৌড়ি, জলপিপি ও পরিযায়ী পাখির দল। কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ; এই অপূর্ব রূপশোভা আরো স্বপ্নচোখে দেখার জন্যে পাহাড়ের চূড়ায় খড়ের ছাউনি তুলে ভেতরে বাঁশের বেঞ্চ পেতে দিয়েছে। এই অনন্ত সৌন্দর্যের সামনে হাজার বছর ঘুমিয়ে থাকা যাবে সৌন্দর্যক্লান্ত চোখ দুটো বন্ধ করে। প্রকৃতির সব রকম সৌন্দর্যের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখি দূরে অনেক দূরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়শ্রেণী। ওই পাহাড়ের শরীর বেয়ে নেমেছে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ পাহাড়ি জলপ্রপাত হামহাম। আমরা এখন হামহাম জলপ্রপাতে যাবো। আচ্ছা, মাধবপুর লেকের এই পাহাড় চূড়া থেকে উড়াল দিয়ে যাওয়া যায় না নীচের জলজ পাখিগুলোর মতো?

পরবর্তী অংশ পড়ুন : মেঘালয়ে মেঘের নীলে (৩)