ভ্রমণ

মেঘালয়ে মেঘের নীলে-১

মেঘালয়ে মেঘের নীলে

এক.

রাত দশটা ছুঁই ছুঁই তখন। সিলেট রেলস্টেশনের বিশাল প্লাটফর্মে থামলো আমাদের ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কালনী এক্সপ্রেস। ট্রেন থেকে নামতেই কানে এলো সিলেটের বিচিত্র কোলাহল। বাতাসে উড়ছে চা-পাতা ও দারুচিনির গন্ধ। নিয়নলাইটের মোলায়েম আলোয় ঝলমল করছে রাতের সিলেট নগরী। গ্লাসে মোড়ানো একটি অটোরিকশায় বসলাম আমরা পাঁচজন। জনবিরল পথ ধরে এগিয়ে চলেছে সুশান্ত গতিতে। প্রায় ঘণ্টাখানেক পথ চলার পর আমাদের বাহন প্রবেশ করলো মিরাপাড়া গাজি বোরহানুদ্দীন রোডে। দ্বাদশ শতাব্দীর শাসক গৌড় গোবিন্দ গাজি বুরহানুদ্দীন রহ.-এর ডান হাতের কব্জি কেটে দেন ও তার শিশু সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। গরু কোরবানির মাধ্যমে নবজাতক শিশুপুত্রের আকিকা করায় এ দণ্ড দেয়া হয়। এ রোডের শেষ সীমান্তেই তার মাজার। পুণ্যভূমি সিলেটে ঐতিহ্যময় এই সড়কের মর্যাদা ও মহিমা অপরিসীম। এ সড়কের মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে আলোচিত একটি নতুন প্রতিষ্ঠানÑ জামিয়াতুল খাইর আল-ইসলামিয়া। উচ্চতর ইসলামী গবেষণা ও চিন্তাকেন্দ্র। অনন্য এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন পাকিস্তানের মুফতি তাকি উসমানি সাহেবের শাগরেদ ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মুফতি আব্দুল মুন্তাকিম। দূর থেকেই ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চোখে পড়লো বড় অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে জামিয়াতুল খাইরের নাম। বেশ সুন্দর সুরম্য চার তলা একটি ভবন। নীচে রাস্তায় অপেক্ষারত মুফতি উবাইদুল্লাহ। আমাদের সহপাঠী ও এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। প্রতিভাবান আলেম ও গবেষক। ইলমুল ফারায়েজে রয়েছে তার বিপুল পাণ্ডিত্য এবং এ বিষয়ে রচনা করেছেন একটি মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ। উবাইদুল্লাহ ভাইয়ের সাথে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠি বিস্মিত আনন্দে। সাজানো সুন্দর ঝাঁ-চকচকে পরিবেশ। দেশী-বিদেশী প্রাচীন ও আধুনিক বিপুল বইয়ের সমাহার চারিদিকে। জ্ঞানগম্ভীর পবিত্র এক জগত।

ভেতরে একটি লাল গালিচা বিছানো রুমে বসতেই সালাম দিয়ে প্রবেশ করলেন কবি মূসা আল হাফিজ। ধীমান আলেম, কবি, গবেষক, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও সময়ের কিংবদন্তি। তিনি এ প্রতিষ্ঠানে আলো বিস্তার করে যাচ্ছেন মধ্যদুপুরের সূর্যের সৃষ্টিমুখর ঐশ্বর্যে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার গবেষণা সৃষ্টি করেছে নতুন বিস্ময় ও আলোড়ন। রাতের দস্তরখানে বিস্তর কথা হলো বিচিত্র বিষয়ে। কবিতা ইতিহাস দর্শন ধর্ম রাজনীতি ও অনেক টুকরো সংলাপ। তিনি বললেন আমাদের ইতিহাসবিমুখ অধ্যয়ন আমাদেরকে ক্রমেই ইতিহাস থেকে মুছে দিচ্ছে এবং বলয়বদ্ধ জীবনচিন্তা পৃথিবীকে উপহার দিতে পারছে না নবতরো কোনো শক্তিÑ যার সামনে বশীভূত হতে পারে অন্তঃসারশূন্য আধুনিক সভ্যতা। আমাদের অধ্যয়নের পরিমণ্ডল আরো অনেক বিস্তৃত ও গভীর হওয়া প্রয়োজন। এজন্য অনিবার্যভাবেই ভাষা প্রসঙ্গ আসবে। আধুনিক আরবির পাশাপাশি ইংরেজিসহ শক্তিশালী ভাষা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যেই দরকার। মিডিয়া শক্তি নিয়ে কথা হলো; উদাহরণত, যদি একজনের হাতে দশটা মিডিয়া দেয়া হয় আর দশ বছর সময় দেয়া হয় তাহলে সম্ভব শেখ সাহেবকে বানাবেন স্বাধীনতার বিপক্ষীয় অপরাধী এবং জিয়াকে বানাবেন স্বাধীনতার মহানায়ক। আরো দশ বছর সময় দেয়া হলে শেখ সাহেব হবেন স্বাধীনতার মহানায়ক ও জিয়া হবেন ঘৃণিত অপরাধী; এবং এটাই একটি সম্ভাবনাময় দুর্বল জনগোষ্ঠীর দুর্ভাগ্যজনক ইতিহাস। কথায় কথায় বেশ রাত হলো এবং দুচোখে জড়িয়ে এলো সফর ক্লান্ত ঘুম।

 

দুই.

খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো। ফজরের পর আবারো বসি কবির মুখোমুখি। নাস্তার ফাঁকে ফাঁকে কথা হলো ভ্রমণের প্ল¬ান নিয়ে। কবি যাবেন শ্রীমঙ্গলে একটি সাহিত্যসভায় আর আমরা বেরুলাম বিছলাকান্দির উদ্যেশ্যে; ভারতের সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড়শ্রেণীর পাদদেশে। প্রায় চল্লি¬শ কিলোমিটার পথ এই টিলাগড় পয়েন্ট থেকে। চারপাশে তখন সকালের আলো তেতে উঠছে। শহরের কোলাহল ফেলে আমাদের সিএনজি ছুটে চললো পাহাড়ি পথ ধরে। দুপাশে ছোট ছোট টিলায় সাজানো চা-বাগান, বিস্তীর্ণ সবুজ অঞ্চল, কখনো ধূ ধূ বিরান মাঠ, হঠাৎ হঠাৎ এক দুটো বাগানবাড়ি, সুন্দর রঙের প্রলেপ দেয়া স্বপ্নের মতো আশ্রয়ের আঁচল, কিন্তু আশপাশে আর কিছু নেই, কোনো মানুষের ছায়া নেই। থাকেন বৃটেনে, দেশের মায়ায় মাঝেমধ্যে এখানে এসে বাতাস নিয়ে যান। টিলায় টিলায় ঢেউ খেলানো সবুজ চাদরে শোভিত মালনিছড়া চা-বাগানের পথে চললো আমাদের সিএনজি। মালনিছড়া বাংলাদেশের প্রথম চা-বাগান। ১৮৫৪ সালে এখানে প্রথম চায়ের চাষাবাদ হয়। চা-বাগান ফেলে আমাদের বাহন এগিয়ে চললো ওসমানি বিমানবন্দরের পেছনে ভোলাগঞ্জের সড়ক ধরে। এই রাস্তাগুলোর খুব মুমূর্ষু অবস্থা, জাফলং থেকে পাথর তুলে হাজার হাজার পাথর বোঝাই ট্রাক এই রাস্তাগুলো দুদ্দাড় দাপিয়ে বেড়ায়, স্থানে স্থানে সিমেন্টের আস্তর উঠে সৃষ্টি হয়েছে গভীর ক্ষত ও গর্ত, গাড়িগুলো ভয়ংকর কাত হয়ে চলছে, বিকট শব্দ তুলে ধীর গতিতে চলছে পাথর বোঝাই ট্রাকগুলো। যে কোনো সময় সিএনজি উলটে যেতে পারে, ধীর গতিতে এগুতে হচ্ছে আমাদেরও এবং ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় ঝাঁকুনি এড়াতে সিএনজির হাতল শক্ত করে ধরে রাখতে হচ্ছে। বেশ ক্লান্তিকর যাত্রা, তবে রোমাঞ্চের নেশায় উজ্জীবিত সবাই।

দূরে অনেক দূরে সামনের আকাশ বরাবর সীমান্তরেখায় দেখা যাচ্ছে কুয়াশার মতো শুভ্র মেঘে আচ্ছন্ন সবুজ পর্বতশ্রেণী। যতই নিকটবর্তী হচ্ছে ততই পাহাড়ের গম্ভীর সৌন্দর্য গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের অনুভূতি। আকাশের এত উপরে যে, শুভ্র মেঘমালা পাহাড়ের অর্ধেকাংশ ভিজিয়ে ঢেকে রেখেছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে কুয়াশার টুপি মাথায় দিয়ে পাহাড়গুলো স্তব্ধ দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের ঘন সবুজ ও মেঘের নীলাভ্রে মিশে তৈরি হয়েছে এক অবিমিশ্র নান্দনিক মায়ালোক। চুম্বুকের মতো টেনে নিয়ে চললো ওই নিঃসীম পর্বতশ্রেণীর নিকটে। চোখের ক্যানভাসে এই পর্বতশোভা দৃশ্যমান রেখে এভাবে প্রায় ঘণ্টাখানে এগিয়ে যেতে হয়। ঘোরের ভেতর চলতে চলতে একটি লোকালয়ে প্রবেশ করলো সিএনজি। এটাকে বলে হাদারপাড় বাজার। অল্প কয়েকশো দোকানপাট, খাবারের হোটেল ও মানুষের বিচিত্র কোলাহল। এরপর ঘন সবুজে ছাওয়া কিছু গাছপালা ও ধূ ধূ মরা প্রান্তর। এখানে বাহন থামিয়ে রেখে দলে দলে পর্যটকরা হেঁটে যাচ্ছে। প্রায় আড়াই তিন মাইল হবে ওই দূরের বিছনাকান্দি পাহাড়শ্রেণী। ভাঙাচোরা এবড়োথেবড়ো লালমাটির পথ। তবুও সিএনজি নিয়ে যাই আমরা। বর্ষায় এখানে পানি থৈ থৈ করে। তখন নৌকা নিয়ে যেতে হয়। শীতকালে নদী শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে থাকে। এটা ভারত থেকে নেমে আসা পিয়াইন নদীর অববাহিকা। পথে পথে পড়ে আছে বড় বড় শিলা-প্রস্তর। স্থানে স্থানে ছোট ছোট জলাশয়ে পিয়াইন নদীর জল থমকে আছে। ভাসমান শাপলাপাতা ও নীলপদ্ম রচনা করে আছে অলৌকিক মায়াজাল। হঠাৎ হঠাৎ উড়াল দিয়ে যাচ্ছে পানকৌড়ি পারিজাত ও বিচিত্র পাখি। একটু পর পর চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসের বিছানা। ধাবমান সিএনজিতে বসেই দেখা যায় অদূর ভারতের মেঘালয় পাহাড়পুঞ্জ। ক্রমেই চোখের কাছে ও পায়ের নাগালে চলে আসছে। পিয়াইন নদীর শেষ তীরে, যেখানে শুরু হয়েছে বিশাল বিশাল শিলা-প্রস্তর ছড়ানো জল ডুবু ডুবু বিস্তীর্ণ প্রান্তর, সেখানে নেমে যাই আমরা। এই তো সামনে স্বপ্নের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের মায়াবতী মেঘালয় পাহাড়গুলো! পাহাড়ে আরোহণ করলেই ভারতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছুঁইয়ে দেয়া যাবে ভাসমান মেঘগুলো! মাথার চুল ভিজিয়ে নেয়া যাবে রংতুলির মতো মেঘের নীলে!

বিছনাকান্দির এই প্রাকৃতিক বিছানা বাংলাদেশ-ভারতের মিলনমোহনা জুড়ে বিস্তৃত। এটাকে নো ম্যানস ল্যান্ড বলে। ১০০ গজের ভেতরেই ভারত। কিন্তু এই সীমান্তে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই, ধূ ধূ পাথুরিয়া ভূমিতে ছোট একটি বাঁশ গেড়ে একটি ফলক ঝুলানো, তাতে লাল রং দিয়ে ছোট্ট করে লেখা ‘ভারত শুরু, অতিক্রম নিষেধ’। দুই দেশের মানুষ এখানে একাকার হয়ে হাঁটছে, ঘুরছে, জলকেলি করছে এবং দুদেশের স্থানীয় গ্রাম্যরা মিলেমিশে পর্যটকদের জন্য স্থাপন করেছে ভ্রাম্যমাণ পণ্যের দোকান ও রেস্তোরাঁ। দুই দেশের সীমান্তপ্রহরী এসব দোকান থেকে বিড়ি সিগারেট নিয়ে ফুঁকছে, গ্রাম্য লোকজন পাথর তোলার কাজে ব্যস্ত, অলস বসে আছে। দূর থেকে যে ঘন নীল পাহাড়পুঞ্জ দেখেছিলাম, এখন সেগুলো আমাদের চারপাশে আকাশে হেলান দিয়ে ছায়া বিস্তার করে দাঁড়িয়ে আছে। পায়ে হাঁটা দূরত্বে এখন মেঘভেভা পাহাড়গুলো। গাঢ় সবুজ এই মেঘালয় পাহাড়ের বুক চিরে নেমে এসেছে অসংখ্য ঝরনা। ঝিরিপথ ধরে নেমে আসছে হিম শীতল জলশিশির। এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছোট বড় অসংখ্য শিলাখণ্ড। এর ভেতর দিয়ে কলকল বয়ে চলেছে ঝরনার জলধারা। ভেজা পায়ে অনেক দূর হেঁটে যাই। অদূরে দুই পাহাড়ের ভেতর দিয়ে একটি ঝুলন্ত সেতু, লাল নীল ভারতীয় গাড়িগুলো সেতুর উপর দিয়ে ছুটে চলছে। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ঝলমল করছে ভারতীয় কুটিরগুলো। আনমনে গ্রামগুলোর কাছাকাছি যেতেই সীমান্তুপ্রহরীদের ভ্রুকুটি চোখে পড়ে। অনেক পর্যটক ডানে বিজিবি ও বামে বিএসএফ দাঁড় করিয়ে দুই জনের মাঝে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে নিচ্ছে।

বড় একটি উপলখণ্ডের উপর বসে ঝরনার জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকি কিছুক্ষণ। অদূরে আফফান ও আরিফ ভাই পাথর-ঝিনুক কুড়িয়ে জলে ঢিল ছুড়ছে। স্বচ্ছ জলের স্রোত শতধা হয়ে পিয়াইন নদীতে মিশে যাচ্ছে উচ্ছলিত আনন্দে। পাথরে আর পানিতে মুগ্ধ পর্যটকরা আয়েশি ভঙ্গিমায় বসে বিভিন্ন পোজে ছবি তোলায় ব্যস্ত। আমাদের সালমান ভাইও কম না। ঝাঁকে ঝাঁকে ছবি নিচ্ছেন; বিচিত্র জাতের পাথরের, ঝরনাজলের, পাহাড়ের, ঝিনুকের এবং আমাদের। ডিএসএলআরটি নিয়ে আমিও বিমুগ্ধ প্রকৃতি ধারণ করতে যাই। তবে ছবিতে যা সুন্দর আসে বাস্তবে তার চেয়ে অনেক সুন্দর ও জীবন্ত। ক্যামেরা কি ধারণ করতে পারে নিসর্গের বিমূর্ত অবয়ব? এরচেয়ে বরং এই পাহাড়ের ছায়ায় বসে দেখি আকাশের গায়ে হেলানো পাহাড়ের ক্যানভাস, স্পর্শ করি ঝরনা জলের অমৃত আনন্দ; পৃথিবী এখানে স্বর্গের অলৌকিক মহিমায় বিমূর্ত, জলপাথরের অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য এখানে রচনা করেছে জীবনের জাদুশিহরণ, এখানে কষ্টচাপা হৃদয় নিয়ে কেউ এলে সম্পূর্ণ নির্ভার হয়ে ফিরবে আপন নীড়ে এবং রাইটার্স ব্লকে অতন্দ্র কবির করতল থেকে ঝরনার মতো ছলছল মুখরতায় ঝরবে শব্দের মিছিল। এভাবে নিঝুম অরণ্যে কতক্ষণ জলমগ্ন ছিলাম অনুমান নেই, রাইহানের ডাকে তন্ময় ভাঙে; যেতে হবে না? আশ্চর্য, এই মাত্র না এলাম এখানে! এখনই যাই কোথায় এই জলপাথরের কেয়ারি, মেঘালয় পাহাড়ের ছায়া, পিয়াইন নদীর জলজ আনন্দ ছেড়ে! তাকিয়ে দেখি চারপাশে রৌদ্রের আলোয় সব পুড়ে যাচ্ছে। পাথরগুলো গরমে তেতে উঠেছে। বসে থাকা সম্ভব না আর। ভেসে আসা কোমল বাতাসেও দরদর করে ঘাম ঝরছে কপাল থেকে। তবে অর্ধেক পাথরের তল দিয়ে বয়ে চলা জল কী শীতল! জলে জলে পা ফেলে হেঁটে যাই অনন্ত সুখের শিহরণে!

 

তিন.

দুপুরের রোদ বেশ নরম হয়ে এসেছে তখন। চারপাশে কেমন ঘুমঘুম আলো, পাহাড়ঘেরা তৃণগুল্মের চাঁপা চাঁপা কাচা সবুজ গন্ধবাহ বাতাস, পথের দুপাশে দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বিস্তারিত সারি সারি বৃক্ষছায়া, দিঘিনালা, ধূ ধূ মাঠ, অরণ্য এবং হঠাৎ হঠাৎ একদুটো মানববসতি; বনপাতায় মোড়ানো ছোট ছোট কুটির, যেন ঘুমের ভেতর আচমকা জেগে ওঠা প্রাণের স্পন্দন। লোকালয়হীন এই নির্জন মানচিত্রের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে সর্পিলাকার পিচপেষা একটা সরুপথ। ভোর থেকেই আমাদের অবিরাম সিএনজি-যাত্রা এই পথে পথে। এখন সীমান্তবর্তী বিছনাকান্দি থেকে রাতারগুল জলজ অরণ্যের পথে আমরা। ছেঁড়া ছেঁড়া বাতাসের ভেতর দিয়ে উড়ে চলছে আমাদের হালকা গুল্মবর্ণের বাহনটি। পথপ্রান্তে একটি গ্রামীণ মসজিদে আসর পড়ে আবারো শুরু হয় ঘোরলাগা যাত্রা। সিলেটের রাস্তাগুলো বড় অদ্ভুত; শহরের ভেতরে যা একটু কোলাহল, শহর থেকে বেরুলেই পথের দুপাশে আকাশছোঁয়া পাহাড়, চা-বাগান কিংবা ধূ ধূ অনাবাদ নিস্তব্ধ জনপথ; পথের দুপাশে কিছু নেই, কিছু নেই, সুনসান বিরান প্রান্তর, হঠাৎ হঠাৎ চোখে পড়ে বিদেশি আদলে গড়া আধুনিক একটা একটা স্বপ্নপুরি, নান্দনিক রঙের প্রলেপ লাগানো একটিমাত্র নিঃসঙ্গ বাড়ি, আশপাশে আর কিছু নেই! মানুষের সাড়া নেই, পাড়া নেই! রহস্যময় নিগুঢ় নির্জনতা এবং দিগন্তব্যাপৃত মরুভূমির হাহাকার!

সিলেটের এমন দৃশ্যাবলীর সাথে আমি তো পরিচিত, কিন্তু আমার তন্ময়ঘোর ভেঙে সিএনজি ঢুকে পড়লো অন্যতরো অচেনা এক পথে। পথের দুপাশে যতদূর চোখ যায় আজনবি শূন্য প্রান্তর, সবুজ ঘাস বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, কিন্তু মনে হচ্ছে কোনোদিন মানবজাতির পদছায়া পড়ে নি এখানে। এই সুনসান প্রান্তরের বুক চিড়ে এঁকেবঁকে সোজা সামনে চলে গেছে একটি পিচপেষা মসৃণ সরুপথ। ভয়ে কেমন গা ছমছম করে উঠলো! শক্ত হাতে সিএনজির রড আঁকড়ে সতর্কভাবে অমৃত নিসর্গসুধা পান করে এগিয়ে যাই অজানা রহস্যলোকের দিকে। মসৃণ পথ শেষে সিএনজি এবার উঠলো এবড়োখেবড়ো শক্ত মাটিপথে। কিছুদূর এগিয়েই পথ শেষ; এই বিজন পথের শেষ প্রান্তে ছোট একটি টিনের একচালা ছাউনি, একটি টংদোকান বলা যায়, কাঠের তক্তায় সাজানো অল্প কিছু বিস্কিট চানাচুর চকলেট বিড়ি-সিগারেট এই, ভেতরে জনা তিনেক মানুষ অলস বসে বসে বিড়ি ফুঁকছে, হাই তুলছে, দুপা এগুলেই চোখের সামনে কংকালসার রুগ্ন মরানদী একটি। মনটা খারাপ হলো, এতদূর এসে তবে ফিরে যেতে হবে? শুনে এসেছি রাতারগুল এশিয়ার অন্যতম সুন্দর পর্যটনকেন্দ্র, আলোচিত জলজ অরণ্য একটি, দেশী-বিদেশীরা এখানে ঘুরে ব্যাপক অভিভূত, কিন্তু এ দেখি ধূসর পাংশু এক বিরানভূমি! আমরা ছাড়া আর কোনো পর্যটক দল নেই। শুকনো নদীতটে কেবল কয়েকটি ডিঙিনৌকা ঘুমিয়ে আছে মরা মাছের মতো। আকাশেও নেই কোনো পাখি। এটাই কি ভ্রমণপ্রেমীদের প্রিয় সেই রাতারগুল জলাবন? দোকানের লোকগুলোকে জিজ্ঞেস করেও খুব ভরসা হচ্ছে না। কেমন ভয় ভয় করছে। এদিকে বিকেল প্রায় নিভু নিভু, রৌদ্রের শেষ ঝলক গাছের পাতায় পাতায় পাততাড়ি গুটিয়ে নিবে একটু পরেই। ভোর থেকে আমাদের সহচারী সিএনজিওয়ালার কাছে নিশ্চিত হয়ে নেই; হ্যাঁ, এটাই আমাদের লাবণ্যময় রাতারগুল জলাবন।

পৃথিবীতে বাইশটি জলে ডোবা বন আছে। অরণ্যের অর্ধেক পানির নীচে আর অর্ধেক উপরে ভাসমান। ইংরেজিতে বলে (ঝধিসঢ় ঋড়ৎবংঃ) সোয়াম্প ফরেস্ট। বাইশটি জলজ অরণ্যের দুটো ভারতবর্ষে; একটি শ্রীলংকায়, আরেকটি আমাদের বাংলাদেশের সিলেট-ভারতের এই সীমান্ত এলাকায়। এই বনাঞ্চল ঘুরে দেখতে হয় নৌকায় জল ভেঙে ভেঙে; সাথে নিতে হয় এক হাতের মুঠোয় থাকা হিংস্র বন্য প্রাণীর অতর্কিত আক্রমণের আতংক, আরেক হাতে অপার্থিব সৌন্দর্যে ঘেরা রহস্য জয়ের সুতীব্র নেশা! ত্রিমাত্রিক দ্বিধার দোলাচলে দুলতে দুলতে অবশেষে একটা ডিঙিনৌকা নিয়ে নেমে যাই মায়াবতী জলতরঙ্গের ভেতর। নৌকা তরতর করে এগিয়ে চলে নদীর চিকণ বাঁক ধরে। দুপাশে স্নিগ্ধ ছায়াদীঘল গাছগাছড়ার সবুজপত্রে মিশে গেছে মাঝবিকেলের রৌদ্রছায়া। বাতাসের ঝাপটায় ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসছে জলভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, সাথে মাতাল করা গুল্মলতার কাচা সবুজ গন্ধ। জলের গন্ধ, মাটির গন্ধ ও সবুজের গন্ধ মিশে প্রকৃতির অদ্ভুত বিমিশ্র মৌতাত মাতিয়ে তুলছে চারপাশের এলোমেলো বাতাসে। গুল্মলতা ভেদ করে নৌকা এক দুটো বাঁক নিতেই রাতালগুলের মূল মুখাবয়ব ভেসে ওঠে মানসপটে, মুগ্ধতা চোখ ছাপিয়ে বুক বেয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সমগ্র অস্তিত্ব জুড়ে। মায়াময় নিসর্গের প্রেমে হৃদয় তুমুল উত্তাল উদ্বেলিত হতে শুরু করে। এ দেখি অচেনা কোন মায়াবী পৃথিবী! বনের যতই গভীরে যাই মুগ্ধতা! যতই গহীনে ঢুকি আশ্চর্য সৌন্দর্যের রহস্যপুরী! চারিদিকে শান্ত নিস্তরঙ্গ জলরাশি, পাহাড়ের ছায়া, অরণ্যের নৈঃশব্দ্য, কী সবুজ বিমূর্ত ছায়া ও মায়া!

দারুণ অদ্ভুত এই জলের রাজ্য! বিচিত্র জাতের বৃক্ষতরু সব গাম্ভীর্যপূর্ণ ছায়া ফেলে নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে আছে; গাছগুলো কোমর পর্যন্ত পানির নীচে ডুবিয়ে জলমগ্ন আর উপরাংশের ডালপালা জলে ভাসমান। কোনো গাছের হাঁটু পর্যন্ত ডুবে আছে পানিতে। একটু ছোট গাছগুলো শরীরের প্রায়টুকু জলে ডুবিয়ে সবুজ ছাতার মতো পাতা বিস্তার করে আছে। ঘন হয়ে জন্মানো গাছপালার কারণে কেমন আঁধার আঁধার ছায়াময় আবহ পুরো অরণ্য জুড়ে। এর ভেতর দিয়ে নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো জীবনের অন্যতম অনুপম স্মৃতি, কিছু বিমুগ্ধপ্রহর। নৌকার ভারসাম্য রক্ষার জন্য স্বাস্থ্যবান কয়েকজন, যেমন আফফান সালমান ও আরিফ ভাই বসেছে নৌকার মাঝখানে সমান্তরালে, সামনের চঞ্চুতটে রায়হান ও আমি এবং পেছনে আমাদের গাইড সোহেল ভাই বৈঠা দিয়ে জলে ঢেউ তুলে নৌকা এগিয়ে নিয়ে চলছে। দুপাশে ছবির মতো সুন্দর সারি সারি হিজল তমাল জারুল করচ অর্জুন কদম বনজাম বরুণ ছাতিম অশ্বত্থ মুর্তা ও অজানা অনেক বৃক্ষের অপূর্ব ঐশ্বর্য! দেহমনে অপূর্ব পুলকে সম্মোহিত হয়ে পড়ি; কী ভাষাহীন অনুপম নিসর্গশোভা চারপাশে! উপরে হিজল গাছের ডালপালাময় ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘপুঞ্জের মতো আলতো শুভ্র বর্ণের ফুল ফুটে আছে থরে থরে, শেষ বিকেলের মোলায়েম আলোয় ফুলগুলো কী সুন্দর ঝলমল করছে! শৈশবে বাসার দেয়ালে টাঙানো ক্যালন্ডারের পাতায় দেখতাম স্বচ্ছ নীলাভ জলে ডোবা সবুজ নয়নাভিরাম বৃক্ষ পাহাড়, ডালে ডালে এমন দুধেল ফুলের শোভা, মন কেমন স্বপ্নে ভরে উঠতো; কল্পনায় জাগতো এমন দুর্দান্ত দৃশ্য কি পৃথিবীতে বাস্তবেই আছে না কম্পিউটারে আঁকা! কিন্তু এখানে এই রাতারগুল জলজ অরণ্যের গভীরে হিজল বৃক্ষের মগডালে দোল খাওয়া শাদা ফুলগুলো দেখে বিশ্বাস হলো ক্যালেন্ডারে আঁকা সেই দৃশ্যচিত্র বাস্তব, বরং ছবির চেয়ে বাস্তবে আরো কত বেশি সুন্দর! কত বিমূর্ত! কত জীবন্ত! এত বেশি সৌন্দর্য সহ্য হয় না পার্থিব চোখে; অসহ্য সুন্দর! সহ্য করতে না পেরে দুহাতে চেপে চোখ বন্ধ করে ফেলি! এ কোন নেশাময় অন্তহীন রূপের জগত? কল্পনায় মুখরিত মায়ালোক না আমার বাস্তব দৃষ্ট এই নশ্বর পৃথিবী?!

অরণ্যের যত গভীরে যাই সবুজ ছায়া তত ঘন হয়ে আসে। চারপাশে কিছু জলাভূমিও চোখে পড়ে। জলের ভেতর চরের মতো মাটির আভাস। এর উপর দিয়ে জেগে আছে ঘন বুনো বৃক্ষশ্রেণী। ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে আছে হিংস্র সব প্রাণী; নীল বল গাই, চিতা, হিংস্র মহিষ, মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, বনমানুষ, বানর, ভোদর, বেজি, শিয়াল, গুইসাপ, অজগর, গোখরা জলধুড়া ও অনেক উভচর প্রাণী। দিনের বেলায় বনের ভেতর কিছুদূর যাওয়া যায়। কিন্তু এখন বিকাল নিভু নিভু প্রায়। নদীও নিরাপদ নয়। অনেক প্রাণীই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকার পেলে। বনের ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছে ৬০ ফুট লম্বা একটি আইসটাওয়ার। পাঁচ তলা সরু ভবনটিতে সিঁড়ি ভেঙে উঠে পুরো বন ও আশপাশের পাহাড় অবলোকন করা যায়। নৌকা থেকে নেমে বনের এক প্রান্ত ধরে এগিয়ে যাই সন্তর্পণে। জলে ভিজে সিমেন্টের আস্তর ভেঙে পড়া জরাজীর্ণ সিঁড়ি। পায়ে পায়ে জাগে ভয়াল শিহরণ। ঘনায়মান সন্ধ্যার ঘন নীলাভ আকাশ ছায়া ফেলেছে বনের জলে। ডুবু ডুবু সূর্যের রক্তিম আলো টলমল করছে। সন্ধ্যার রক্তভেজা নীলাভ আলো, অরণ্যের ঘন সবুজ ছায়া ও জলের ঘোলা রং মিশে সৃষ্টি হয়েছে বিমিশ্র এক দৃশ্যপট। সুদূর উত্তরে মেঘালয় থেকে নেমে আসা জলধারা গোয়াইন নদীতে পড়ে সরু শাখা খাল হয়ে প্লাবিত পুরো রাতারগুল। পুরো সাড়ে তিন হাজার একর অরণ্যাঞ্চল চোখের সামনে অপূর্ব চিত্রপটে বিমূর্ত হয়ে উঠেছে। ৬০ ফুট উপরে দাঁড়িয়ে দেখা এই অরণ্যশোভা হৃদয়ে ছড়িয়ে যায় অদ্ভুত হাহাকার। আধো ডোবা রাতাগুল্মের ডালপালা জ্বলজ্বল করছে শেষ বিকেলের আলোয়। রাতা বেতের অল্প কিছু ফুল বাতাসে দোল খেয়ে যাচ্ছে। উফ, কী অপূর্ব দৃশ্য!

এই পুণ্যভূমিতে এখানে এই অপূর্ব নিসর্গে কত কাল আগে এসেছিলো কোন মুসলিম দরবেশ যার বিমুগ্ধ উচ্চারণে ফুলের বদলে গুল হলো! বাংলা ফুলের বদলে ফারসি গুল! বাংলা বেতের বদলে আরবি রাতা! বেতের ফুল দেখে বিমুগ্ধ যবানে কে বলেছিলেন রাতার গুল! এই মিহিন রাতায় বোনা শীতল পাটিতে কত নামাজ পড়ি! খুব ইচ্ছে হলো এই রাতারগুলে শীতল পাটি বিছিয়ে সন্ধ্যা-সালাত আদায় করি; সেজদায় লুটিয়ে পড়ি এই অলৌকিক রূপমঞ্জরির শিল্পীর সামনে! আকাশের একাংশে লাল রং ছড়িয়ে সূর্য ডুবি ডুবি করছে। গাইডের জোড় তাড়ায় নেমে আসতে হয়। বনে আর থাকা মোটেও নিরাপদ নয়। ঝুপঝুপ করে নেমে আসছে তরল আঁধার। দ্রুত বৈঠা ফেলে নৌকা যখন তীরের কাছাকাছি প্রায় তখন কানে ভেসে এলো পেছনে বনের ভেতর থেকে গা ছমছম করা সম্মিলিত অস্ফুট নিনাদ, অদূরে জলে আলোড়িত হতে থাকে প্রবল সাঁতারের শব্দ। কোনোমতে ডাঙায় পা ফেলে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখি জীবনের অন্যতম অনাবিল সৌন্দর্য; মেঘ ও অরণ্যের নীল-সবুজ মিলনরেখায় ঘন রক্তাভ লাল টকটক করছে! কী অলৌকিক সম্মোহন এ! আগেও সূর্যাস্ত দেখেছি অনেক; বঙ্গোপসাগরে, পাহাড়ের চূড়া থেকে, কিন্তু এ কোন অচেনা পৃথিবীর সূর্যাস্তশোভা! তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকি কতক্ষণ। বুকের ভেতর গেঁথে যায় এই অপূর্ব লালিমা, এখনো বুকে হাত দিয়ে আঙুলে মেখে নেই সেই নীল ও লাল রঙের শিহরণ!

পরবর্তী অংশ পড়ুন : মেঘালয়ে মেঘের নীলে (২)