ইতিহাস

বাংলাদেশের সাহাবা মসজিদ : ইতিহাস গবেষণার নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের সাহাবা মসজিদ : ইতিহাস গবেষণার নতুন দিগন্ত

এক.

আকাশছোঁয়া হিমালয় পর্বতশ্রেণির তুষারগলা জলধারা বিধৌত প্রাচীন দ্রাবীড় বাংলার তিস্তা নদীর অববাহিকার একটি জনপদের বর্তমান নাম লালমনিরহাট। আঠারো উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ‘বেঙ্গল ডুয়ার্স রেলপথ’ নির্মাণের সময় মাটি খনন করতে গিয়ে উঠে আসে প্রাচীন কোনো সভ্যতার লাল পোড়া ইট-নুড়ি-মুক্তা-মনি। সেই থেকে এ জায়গার নাম ‘লালমনি’ এবং ‘লালমনির হাট’। ইতিহাসের পাতা খুলে দেখা যায় তিস্তা নদীর এ অববাহিকায় প্রাচীন বাংলার একটি সমৃদ্ধ জনপদ ছিলো। গড়ে উঠেছিলো মানুষের পদভারে মুখরিত সভ্যতা। এখানে মাটির নীচে ধ্বসে পড়া প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ সেকালের নগরীর প্রমাণ বহন করে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম অববাহিকার একটি এই তিস্তা নদীর অববাহিকা। ঈসাপূর্ব প্রাচীন বাংলায় যে দ্রাবীড় সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো তাদের সাথে রোমান ও আরব বণিকরা নৌপথে পণ্যবাহী জাহাজ নিয়ে বাণিজ্যসূত্রে আসাযাওয়া করতো। ঈসায়ী সপ্তম শতাব্দীতে আরবের বুকে ইসলামের আবির্ভাব হলে সাহাবাগণ ছড়িয়ে পড়েন পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে দিগন্তে দিগন্তে। গঙ্গা ও তিস্তা বিধৌত আমাদের ভাটিবাংলায়ও সমুদ্রপথে আরব থেকে আগমন করেন অনেক নাম না জানা অনেক সাহাবী ও তাবেয়ী।

প্রাচীন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূলে ছিলো পৃথিবীর বিখ্যাত জাহাজ শিল্প কারখানা। হাজার বছরের প্রাচীন মূল্যবান কাঠ, বৃক্ষ, তুলা, মসলা ও মসৃণ কাপড় মসলিনের জন্য ছিলো পৃথিবীর বিখ্যাত বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র ও তীর্থভূমি। প্রাচীন গ্রিক পণ্ডিত প্লিনি তার ‘পেরিপ্লাস অব ইরিত্রিয়ান সী’ গ্রন্থে ও বিখ্যাত ভূগোলবিদ টলেমি তার গ্রন্থে প্রাচীন পৃথিবীর বর্ণনা দিয়েছেন। তাদের বর্ণনা থেকে জানা যায় প্রাচীন বাংলার ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীর পাড় ধরে ভারতের সিকিম হয়ে চীনের ভেতর দিয়ে আরব বণিকদের বাণিজ্যবহর আসাযাওয়া করতো। সেই ঈসাপূর্ব সময় থেকেই ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা দিয়ে চীন ও ভারতবর্ষ থেকে রোমান ও আরবরা পণ্য নিয়ে যেতো। হিজরি তৃতীয় শতকের আরব বণিক সুলাইমান সাইরাফি তার ভ্রমণকাহিনী ‘আজায়েবুদ দুনিয়া’ গ্রন্থে প্রাচীন বাংলার রোমাঞ্চ জাগানো বর্ণনা দিয়েছেন। তার গ্রন্থে হাতে আঁকা মানচিত্রে বর্তমান বঙ্গোপসাগরের স্থানে দেখা যায় ‘বাহরু হারগিন্দ’, অর্থাৎ হারগিন্দ সমুদ্র। চট্টগ্রামের রামু নদী, রংপুরের নদীবন্দর ও সিলেটের আলোচনাও তিনি করেছেন। সেকালে ব্যবহৃত বেশ কিছু বাংলা শব্দও তার গ্রন্থে দেখি আমরা। ১৩৪৫ ঈসায়ী সালে আলজেরিয়ার পরিব্রাজক ইবনে বতুতা চীনে যাওয়ার পথে আমাদের ‘বাঙালা মুলুকে’ আগমন করেছিলেন। তিনি চট্টগ্রামে, সোনারগাঁয়ে, সিলেটে বিভিন্ন দ্বীপে আরব মুসলমানদের বসবাস করতে দেখেছেন বলে তার ভ্রমণকাহিনী ‘তুহফাতুন নাজজার ফি গারাইবিল আমসার ওয়া আজাইবিল আসফার’ গ্রন্থে লিখেছেন।

হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর মুহাদ্দিস আবাদান মারওয়ায়ী রহ. লিখেছেন, ‘সাহাবী আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনে ওয়াহাইব রা. নবুওতের পঞ্চম বছর হাবশায় হিজরত করেন। নবুওতের সপ্তম বছর তিনজন সাহাবী ও কিছু সংখ্যাক আবিসিনীয় তাবেয়ীকে সাথে নিয়ে দুইটি সমুদ্রগামী জাহাজে করে চীনের পথে সফর শুরু করেন তিনি।’ নবুওতের ৫ম বছর ঈসায়ী ৬১৫ সালে আরবের জেদ্দা সমুদ্রবন্দর থেকে জাহাজে করে আফ্রিকার ইথিউপিয়ায় যাত্রা করেছিলেন ১৬ জন সাহাবী। ইথিউপিয়ার (তৎকালীন হাবশা) বাদশা নাজ্জাশী সাহাবীদেরকে তার দেশে নাগরিকত্ব দান করেন এবং ব্যক্তিগত ও হৃদ্যিক সম্পর্কও গড়ে তোলেন মুসলমান সাহাবীদের সাথে। ২ বছর পর নবুওতের সপ্তম বছর ৬১৭ সালে বাদশা নাজ্জাশীর উপহার দেয়া নৌযানে ১৬ জন সাহাবীর ১২ জন সাহাবী আরবে ফিরে যান। অবশিষ্ট ৪ জন সাহাবী দুটো জলযানে চীনের পথে রওনা করেন। তারা হলেনÑ ১. আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনে ওয়াহাব রা.। ২. তামীম আনসারী রা.। ৩. উরওয়াহ ইবনে আসাসা রা.। ৪. আবু কায়েস ইবনে হারিসা রা.। তাদের সঙ্গে আরো ৭ জন তাবেয়ীর নাম পাওয়া যায়। তারা হলেনÑ ১. মুহাম্মাদ মামুন রহ.। ২. মুহাইমিন রহ.। ৩. আবু তালিব রহ.। ৪. মুরতাজা রহ.। ৫. আব্দুল্লাহ রহ.। ৬. হামিদ উদ্দিন রহ.। ৭. হুসাইন উদ্দিন রহ.।

আর চীনের মুসলমানদের ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত তথ্য হলো, নবুয়তের ষোলতম বছর (হিজরী ৩য় সাল, ঈসায়ী ৬২৬ সাল) হযরত আবু ওয়াক্কাস রা.-এর নৌবহর চীনের ক্যান্টন বন্দরে নোঙর করেছে। সেখানে হযরত আবু ওয়াক্কাস রা. ও তার সফরসঙ্গী সাহাবী ও তাবেয়ীগণ একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। চীনের সমুদ্রবন্দরে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে কোয়াংটা মসজিদ। মসজিদের অদূরেই তার কবর ও মাজার। আর সহযাত্রী তামিম ও উরওয়া রা.; এই দুই জন সাহাবীর কবর পার্শ্ববর্তী উপকূলীয় প্রদেশ ফুকিং শহরের চুয়ানচু বন্দরে লিং পাহাড়ের চূড়ায় সমাহিত। চতুর্থ সাহাবী কায়েস রা.-এর কবর দেশের অভ্যন্তরে।

ইথিউপিয়া সমুদ্রবন্দর থেকে ভ্রমণ শুরু করে চীনের সমুদ্রবন্দরে নোঙর করার মাঝখানে ৯ বছর অতিবাহিত করেছেন তারা। আফ্রিকা থেকে চীন পর্যন্ত সে সময়ের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ নৌবন্দর ছিলো পাকিস্তানের দেবল বন্দর, ভারতের মালাবার বন্দর ও বঙ্গদেশের চট্টগ্রাম বন্দর। মাঝের নয় বছর তারা এসব বন্দরে নোঙর করবেন জাহাজের কয়লা কাঠ ও খাদ্যের যোগান সংগ্রহের জন্য। দেবল ও মালাবার বন্দরে তাদের অবতরণ সম্পর্কে স্থানীয়দের লিখিত ইতিহাস পাওয়া গেলেও চট্টগ্রামের স্থানীয় লোকদের লেখা ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে তাদের আগে পরের বিদেশীদের লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় আর বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় কিছু আরবি হরফের শিলালিপি পাওয়া যায়।

 

দুই.

সাহাবা ও তাবেয়ীগণ পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছেন প্রথমে মসজিদ নির্মাণ করেছেন। সাহাবা যুগের বিভিন্ন দেশের সমুদ্রবন্দরে সাহাবাদের নির্মিত মসজিদ এখনো সে সাক্ষ বহন করে চলেছে। ইথিউপিয়ার ইরিত্রিয়া সমুদ্রবন্দরের সাহাবা মসজিদ এখনো বিদ্যমান। ভারতের মালাবার সমুদ্রবন্দরের সাহাবা মসজিদ এখনো বিদ্যমান। চীনের ক্যান্টন সমুদ্রবন্দরের সাহাবা মসজিদ এখনো বিদ্যমান। শুধু বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কোনো সাহাবা মসজিদ বিদ্যমান নেই। বিদ্যমান না থাকার অনেক কারণ বিদ্যমান রয়েছে। সাহাবাগণ ভবিষ্যত সংরক্ষণের চিন্তা না করে শুধু নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদ নির্মাণ করেছেন, কোনো শিলালিপি যুক্ত করেন নি, ফলে কালের কড়ালগ্রাসে নিশ্চিহ্ণ হয়ে গেছে কিংবা মসজিদ রূপে বহাল থাকলেও পরবর্তীতে সংস্কারকগণ শুধু মসজিদ সংস্কার করেছেন। কিংবা এ দেশের মানুষ সে কালে লিখে রাখেনি, কারণ দেড় হাজার বছর আগের কোনো বাংলা গ্রন্থ কিংবা বাঙ্গালির লেখা গ্রন্থ পাওয়া যায় না। লিখিত কোনো গ্রন্থ থাকলেও তা বিভিন্ন যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গেছে।

তবে আশার আলো হয়ে ১৯৮৭ ঈসায়ী সালে প্রাচীন তিস্তা অববাহিকায় রংপুরের লালমনিরহাটে সাহাবা যুগের একটি মসজিদ, মিহরাব, মিম্বার, ঈদগাহ ও শিলালিপির সন্ধান মিলেছে। সর্বশেষ মৃত্যুবরণকারী সাহাবী আবু তুফায়েল আমের ইবনে ওয়াসেলা রা. ইন্তেকাল করেছেন ১১০ হিজরী সালে। আর মসজিদের শিলালিপিতে প্রাপ্ত সাল হলো ৬৯ হিজরি। তখন ঈসায়ী ৬৮৯ সাল। অর্থাৎ রাসূল সা.-এর ইন্তেকালের ৫০ বছর পর নির্মিত হয়েছে মসজিদের প্রাপ্ত অবকাঠামো। প্রত্নতত্ত্ব গবেষকদের মতামত হলো, আবিসিনিয়া থেকে চীনগামী সাহাবাগণের জামাত সেই মসজিদ কাচা উপাদান দিয়ে নির্মাণের পর তা ৬৯ হিজরিতে পাকা ইট দিয়ে সংস্কার করা হয় এবং সে হিসেবে তখনকার স্থানীয় তাবেয়ীগণ মেরামত ও পুন:নির্মাণের সাল শিলালিপিতে উৎকীর্ণ করে দেন। কারণ সে কালে সুন্দরবন সোনারগাঁও, রংপুর, সিলেট দিয়ে নৌপথ ছিলো। আরব পর্যটকদের ভ্রমণকাহিনীতে রংপুরের (বাহরুর রঞ্জ/বাহরুর রঙ্গ) নদীবন্দরেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। আবু ওয়াক্কাস রা-এর কাফেলাও সে পথে পরিভ্রমণ করে থাকবেন। কিংবা তাদের হাতে ইসলামগ্রহণকারী কোনো তাবেয়ী সেই মসজিদ নির্মাণ করে থাকবেন। মোটকথা, যেহেতু সাহাবা যুগে নির্মিত মসজিদ, তাই এই মসজিদটিকেও সাহাবা মসজিদ বলা হয়। স্থানীয়রা নাম দিয়েছে ‘৬৯ হিজরি সনের হারানো সাহাবা মসজিদ’।

উদ্ধারকৃত মসজিদের স্থানের নামের ভেতর রয়েছে আরো একটি রহস্য। এলাকাটির বর্তমান নাম তীরের গড়। স্থানে স্থানে ঝোঁপঝাড় ও খালবিল। বিরান ভূমি। অনেক দিন কোনো লোকালয় ছিলো না সেখানে। অল্প এক দুইটি ক্ষুদ্র কুটিরে কিছু দরিদ্র লোক বাস করতো। তীড়ের গড়ের আধা কিলোমিটার সীমায় লোকমুখে এলাকাটির নাম ছিলো মসদের আড়া। পুরুষানুক্রম বা বংশ পরম্পরায় স্থানীয় কোনো বাসিন্দা নেই। অল্প কিছু হিন্দু ও মুসলিম বাস করতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ করে বাংলাদেশ হলে হিন্দুরা অল্প মূল্যে মুসলমানদের নিকট সব বিক্রি করে চলে যান। তাদের মুখে শোনা নাম হলো ‘মসদের আড়া’। বর্তমান বাসিন্দাদের অধিকাংশই উত্তরবঙ্গের যমুনা ব্রম্মপুত্র নদীভাঙন ও বন্যার কবলে সহায়-সম্বল ও ভিটামাটি হারিয়ে নিরুপায় হয়ে জনবিরল এ বিরান এলাকায় এসে আশ্রয় নিয়ে জঙ্গলাপূর্ণ জমি নাম মাত্র দামে কিনে নেন। লালমনিরহাটের এ পঞ্চগ্রামের জঙ্গলাপূর্ণ এলাকা পরিষ্কার করে করে লোকজন ঘরবাড়ি করতে থাকে।

মসদের আড়া তখনও অনেকটাই অনাবাদ ও পরিত্যক্ত বিরান জমি। ১৯৩৯ খৃস্টাব্দে পাকিস্তানি সরকার লালমনিরহাটের খামার হারাটি এলাকায় বিমানবন্দর নির্মাণ শুরু করলে স্থানীয় বাসিন্দারা গৃহহীন হয়ে পড়ে। সে এলাকার বাসিন্দা শালেয়া মামুদ ও আরো ১০/১২ টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এই ‘মসদের আড়া’ জমিটি কিনে নেন। ১৯৪০ সালে পচা দালাল নামে একজন থেকে ছয় একর জমি ১০০ টাকা দিয়ে কিনে নেন জেলা সদরের পৌর এলাকার খামার হাটি মহল্লার শালেয়া মামুদ। নতুন কেনা মসদের আড়ার জঙ্গলপূর্ণ স্থান ও ঝোঁপঝাড় কেটে পরিষ্কার করে ঘর তোলেন ও চাষাবাদ শুরু করেন। শালেয়া মামুদের ছেলে ইয়াকুব আলি একটি স্তুপাকৃতির জঙ্গলাবৃত ঝোঁপের সামনের জায়গাটি পরিষ্কার করে ঘর তোলেন। ঝোঁপের স্তুপাকৃতির ঢিবির উপর প্রাচীন একটি বিশালাকৃতির পাইকর বৃক্ষ ছায়া করে দাঁড়িয়ে ছিলো। স্থানটিকে সবাই ‘মসদের আড়া’ বলতো ও আশপাশ থেকে লোকজন আগে থেকে চলে রীতি অনুযায়ী ঢিবির মাটিতে আগরবাতি ধূপ মোমবাতি ফুল ইত্যাদি লাগিয়ে যেতো। মজদের আড়ায় চাষাবাদ করার জন্য জমির মালিক ইয়াকুব আলির আত্মীয় নবাব আলি ১৯৮৩ সালের দিকে খুড়তে শুরু করে করেন। টিলাটি খোঁড়া শুরু হলে ঢিবির মাটি থেকে বিভিন্ন সাইজের পোড়া লাল ও কাচা ইট বের হতে থাকে। স্থানীয় লোকজন ধারণা করছিলেন, পুরোনো কোনো জমিদার কিংবা রাজরাজড়ার বাড়ি হয়তো এখানে ছিলো।

১৯৮৬ সালের শেষের দিকে জঙ্গলাবৃত ঢিবির উপরের বটবৃক্ষ সদৃশ শত শত বছরের স্বক্ষ্যবাহী প্রাচীন পাইকড় বৃক্ষটি কেটে ফেলতে শুরু করে স্থানীয়রা। বৃক্ষের গুড়ি কাটার সময় ঢিবির মাটি থেকে বিভিন্ন সাইজের পোড়া লাল ও কাচা ইট নির্মিত পুরোনো একটি ভবনের ছাদের মতো আবিষ্কার হয়। তবে শেকড়ে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে ফাটল ধরা ও দুর্বল হয়ে পড়া ভবনের ইট খুলে খুলে বেরিয়ে আসে। স্থানীয়রা যে যার মতো ভাঙা ইটের টুকরো নিয়ে যায় এবং বেশির ভাগই নিজেদের বাড়িঘরের কাজে লাগায়। ঢিবি সংলগ্ন ঘরের বাসিন্দা আইয়ুব আলি ১৯৮৬ সালের শেষ দিকে নিজের ঘরের প্রয়োজনে কয়েকটা আস্ত অক্ষত ইটের সন্ধানে ঢিবির মাটি সরাতে সরাতে মাটি ও ভাঙ্গা ইটের ভেতর থেকে কয়েকটি অক্ষত ইট পেয়ে যান এবং একটি ইটে আরবি হরফে কালেমা ও কিছু লেখা দেখেন। সাথে নকশা করা আরো কয়েকটা ইট। সেগুলো নিজের ঘরে এনে চাপকলের পানিতে ধুয়ে মাটি ও ময়লা পরিষ্কার করে দেখেন পোড়া মাটির ফলকটিতে আরবিতে খোদাই করা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ, ৬৯ হিজরী’। তিনি তখন ঢিবির ইটের স্তুপকে পুরোনো কোনো মসজিদের ধ্বংসাবশেষ বলে অনুমান করেন। তখনই আশপাশের লোকদের জানিয়ে যত্ন সহকারে টিলা খুড়তে খুড়তে আবিষ্কার করেন মাটির নীচে চাপা পড়া চারদিকে ইটের দেয়াল, কিবলার দিকে মিহরাব, দরজার বাইরে দক্ষিণাংশে তিন সিঁড়ির মিম্বার, একটি পরিপূর্ণ মসজিদের অবয়ব ও মসজিদের বাইরে সামনে পাকা ইট বিছানো ছোট একটি ঈদগাহ মাঠ। এ দৃশ্য দেখে এলাকাবাসী বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে পড়েন। মসজিদের সীমানায় বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয় মেরামত করে নামাজ আদায় শুরু হয়।

তিন.

দেশী বিদেশী প্রত্নতত্ত্বের গবেষকগণ (বৃটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিল তাদের অন্যতম) উদ্ধারকৃত মসজিদ ও শিলালিপি পরীক্ষা করে বলেছেন এটা অনেক প্রাচীন স্থাপত্য এবং ফলকটি হাজার বছর আগের। মসজিদের উপর কালের আবর্তে জমে ওঠা ঢিবির উপরে গজে ওঠা পাইকর বৃক্ষ সম্পর্কে উদ্ভিদবিশারদদের মতামত হলো এটি হাজার বছরের অধিক কাল আয়ুপ্রাপ্ত একটি বৃক্ষ। সহজেই অনুমান হয় মসজিদ এলাকা বিরান হওয়ার অনেক পরে মাটি ও জঙ্গলা আকীর্ণ হয়েছে। তারও অনেক পরে সেখানে ঢিবিতে প্রাচীন পাইকর বৃক্ষটি জন্ম নিয়েছে। ঢিবি ও টিলার জনশ্রুত আদি নাম হলো ‘মসদের আড়া’। মসজিদটি উদ্ধার হওয়ার পর নামটি যে আরবি শব্দবন্ধ তাও উঠে এসেছে গবেষকদের নিকট। ‘মসদ’ শব্দটি আরবি ‘মসজিদ’ শব্দের অপভ্রংশ এবং ‘আড়া’ শব্দটি আরবি ‘হারা’ শব্দের অপভ্রংশ। হারা মানে পাড়া বা মহল্লা। মিসরীয় সাহিত্যিক নাজিব মাহফুজ (১৯১১-২০০৬) যে বইয়ের জন্য ১৯৮৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন তার নাম হচ্ছে ‘আওলাদু হারাতিনা’, অর্থাৎ আমাদের ‘পাড়ার ছেলেরা’। আরবি ‘হারা’ শব্দ থেকেই বাংলা ‘আড়া’ শব্দের উদ্ভব বলে মনে করা হয়। কারণ আরবি-বাংলা দুই ভাষাতেই শব্দটির ধ্বনি-অর্থ-প্রয়োগ এক ও অভিন্ন। প্রাচীন জনপদে এখানে মসজিদ ছিলো বিধায়ই লোকমুখে নামটি চলে আসছিলো ‘মসদের আড়া’, অর্থাৎ মসজিদ পাড়া। মসজিদ আবিষ্কারের আগ থেকেই লোকমুখে চলে আসা ‘মসদের আড়া’ শব্দের ভেতর দিয়ে যেন হারিয়ে যাই হাজার বছর আগে, যখন মক্কা থেকে ইসলামের মশাল হাতে সাহাবাগণ পৃথিবীর দূর দূরান্তে; ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দিয়ে আমাদের এ ভূখণ্ডেও হয়তো আগমন করেছেন তারা; হেঁটেছেন এই বাংলার আলো-বাতাস গায়ে মেখে। এমনটা হতে পারে; হতেই পারে! এজন্যেই বাংলাদেশের কবির কণ্ঠে সুর মিলিয়ে বলিÑ

ইসলাম যেথা জন্মেছে সে আরব থেকে বহু দূরে,

সবুজের বুকে লাল সূর্যটা ওঠে আজানের সুরে।

রাসুলের যুগ হতে পনেরশ বছর পরেও এসে,

ঈমানের দ্বীপ জ্বলে ঘরে ঘরে আমার বাংলাদেশে।

এ যে রাসুলের দোয়ার ফসল এ যে আল্লাহর দান।

বাংলাদেশের মুসলিম আমি বাঙ্গালী মুসলমান।

আমি দূর মক্কার ইসলাম থেকে কিছুতেই নহি ভিন্ন।

ওই সুন্দরবনে পড়েছে আমার সাহাবার পদচিহ্ন।

– কবি মুহিব খান

 

 

তথ্যসূত্র

১.   আজায়েবুদ দুনিয়া, সুলাইমান সাইরাফি

২.   তুহফাতুন নাজজার ফি গারাইবিল আমসার ওয়া আজাইবিল আসফার, ইবনে বতুতা

৩.   তাহজিবুল কামাল, ইমাম জামালুদ্দিন আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ

৪.   ৬৯ হিজরির মসজিদ ও বাংলাদেশে ইসলামের আগমন, চঞ্চল মাহমুদ, মদীনা পাবলিকেশান্স

৫.   চট্টগ্রামে ইসলাম, ড. আব্দুল করীম, ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রাম

৬.   সন্দ্বীপের ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি, হুমায়ুন রাজীব

৭.   বাংলাদেশের ইতিহাস, আব্দুর রহীম, নওরোজ কিতাবিস্তান

৮.  সাড়ে তেরো শ বছর আগের মসজিদ, দৈনিক প্রথম আলো, আগস্ট, ২০১৩ ঈসায়ী