প্রবন্ধ-নিবন্ধ

একজন সাহাবি কবির জীবনকাব্য

একজন সাহাবি কবির জীবনকাব্য

৬২২ খৃস্টাব্দের জুন মাস। প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সা.-এর নবুওতের তেরোতম বছর। হজের উৎসবে মুখরিত পবিত্র মক্কা নগরী। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আসছে হজ আদায় করতে। ইয়াসরিব থেকে এলো পঁচাত্তর জন নারী-পুরুষের একটি কাফেলা। আরবের খ্যাতনামা কয়েক জন লেখক, কবি ও সাহিত্যিক আছেন কাফেলায়। তাদের একটি গোপন উদ্দেশ্য হচ্ছেÑ নবী মুহাম্মাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। প্রিয় জন্মশহর মক্কার লোকদের নিষ্পেষণে অতিষ্ঠ হয়ে নিরুপদ্রপ আশ্রয় খুঁজছেন নবী মুহাম্মাদ; আর আদিগন্ত সবুজের ছায়াভরা স্নিগ্ধ শহর ইয়াসরিবের অধিবাসীরা খুঁজছেন উপযুক্ত নেতা ও শাসক। হজের দ্বিতীয় রাতের মধ্যপ্রহরে গভীর ঘুমে নিমজ্জিত পৃথিবী; ঠিক সে মুহূর্তে পবিত্র কাবার অদূরে দুর্গম পাহাড়ের আড়ালের গিরি উপত্যাকায় জমায়েত হয় কাফেলার নারীপুরুষ সবাই। এ গোপন নক্ষত্রকুঞ্জের মাঝে আলোর চন্দ্রগোলক নবী মুহাম্মদ সা.। খুব সাধারণ সম্মিলন হলেও এটাই ঐতিহাসিক ‘বাইয়াতুল আকাবা’। নবীর হাতে হাত রেখে শপথ করেন কাফেলার সবাই; আঁধার ছেড়ে প্রবেশ করেন আলোর দিগন্তে, ইসলামের কালেমায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তাদের হৃদয়জগত। অতঃপর রাসুলকে ইয়াসরিবে দাওয়াত দেন তারাÑ আপনি হবেন আমাদের সবুজ শহরের সম্মানিত বাদশাহ। আপনার শুভাগমন আমাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। আল্লাহর ইশারায় সম্মতি জানিয়ে দেন রাসুল সা.। এরপর প্রাথমিক চুক্তির প্রস্তাবনায় কাফেলা থেকে ১২ জন নকিব ও প্রতিনিধি নির্বাচন করতে বলেন, তারা ইয়াসরিবে গিয়ে তাদের গোত্রের জন্য রাসুলের মুখপাত্র ও দায়িত্বশীল হবে। নির্বাচিত ১২ জন নকিব ও জনপ্রতিনিধির অন্যতম হলেন ইয়াসরিবের বিখ্যাত খাজরাজ গোত্রের কবি ও লেখক আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। রাসুল সা. বললেনÑ ‘তোমরা আমার হাওয়ারি; ঈসা ইবনে মারইয়ামের যেমন ১২ জন হাওয়ারি ছিলো। পাশাপাশি তোমাদের কওমেরও কাফিল ও জনপ্রতিনিধি; তোমাদের মুখ থেকে আমি তাদের কথা শুনবো।’

আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা ছিলেন সে যুগের আরবের শ্রেষ্ঠতম কবিদের একজন। সেই অজমূর্খতার যুগে তিনি কবি কায়েস ইবনে খুতাইমের সঙ্গে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক কবিতা লিখে ও বলে প্রতিযোগিতা করতেন। বাইয়াতুল আকাবায় সে রাতে ইসলাম গ্রহণের পর তার কবিতা ও কবিসত্ত্বার বাঁক পরিবর্তন হয়। আগে কাব্য রচনা করতেন প্রতিমার প্রশংসায়; এখন কাব্য গাঁথেন রাসুলের স্তুতি বর্ণনায়। আগে কবিতা লিখতেন শিরক ও অবিশ্বাসের কুহেলিকায়; এখন কবিতা লেখেন ঈমান ও বিশ্বাসের শক্তিমত্তায়। আগে ছিলেন কবি এবং কবি; আর এখন তিনি কবি এবং সাহাবি!

পবিত্র কোরআনে ‘সুরা কবি’-তে কবিদের উদ্দেশ্যে আয়াত অবতীর্ণ হলোÑ ‘কবিদেরকে তারাই অনুসরণ করে যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখনা তারা উদভ্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং যা করে না তাই বলে বেড়ায়!’ । কবি সাহাবিদের মন খারাপ হলো। কবি হাসসান ইবনে সাবেত, কবি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা, কবি কাব ইবনে মালেক প্রমুখ সাহাবিগণ বিচলিত ও ভীতসন্ত্রত হয়ে পড়েন। কাঁদতে কাঁদতে রাসুুলের কাছে চলে আসেনÑ ইয়া রাসুলাল্লাহ! এই আয়াত নাজিলের সময় আল্লাহ তো জানতেন আমরা কবি! তখন রাসুল সা. আয়াতের পরবর্তী অংশÑ ‘কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আল্লাহকে বার বার স্মরণ করে ও অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে’ পাঠ করলেন এবং বলেনÑ এই হচ্ছো তোমরা! । স্বস্তি ফিরে পান কবি সাহাবিরা!

একদিন মসজিদে নববীর আঙিনায় বসে আছেন রাসুল সা.। চারপাশে ঘিরে কয়েক জন সাহাবি। অদূরে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.। রাসুল সা. কাছে ডাকলেন তাকে। বললেনÑ আবদুল্লাহ! কিছু কবিতা শোনাও। তোমার কবিতা শুনতে চাই। অবিশ্বাসীদের সম্পর্কে বলো। স্বরোচিত কবিতা আবৃত্তি শুরু করলেন কবি ও সাহাবি। আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা.। কবিতা শুনে রাসুল সা.-এর মুখে হাসির উচ্ছ্বাস! মুগ্ধ স্বরে বললেনÑ আল্লাহ তোমাকে দৃঢ়পদ রাখুন।

পঞ্চম হিজরির কথা। খন্দক যুদ্ধের প্রচণ্ড কর্মমুখর মুহূর্ত। মদিনার চারপাশে পরিখা খনন চলছে। রাসুল নিজেও কাজ করে চলেছেন আর ঠোঁটে দোল খাচ্ছে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার রচিত কবিতাÑ ‘তোমার সাহায্য বিনা হে প্রভু, পাই কীভাবে সঠিক পথ? তুমি না জানালে করতাম কীভাবে নামাজ-রোজা-হজ-জাকাত? দাও প্রশান্তি আমাদের ওপর, যুদ্ধে রাখো অটল মোদের; রুখবো এবার জুলুম-অনাচার, তারিয়ে দেবো অবিশ্বাসীদের।’

হুদাইবিয়া সন্ধির পরের বছর। সপ্তম হিজরির কথা। ‘উমরাতুল কাজা’ আদায় করছেন রাসুল সা.। উটের পিঠে চড়ে জন্মশহর মক্কায় প্রবেশ করেন মদিনার বাদশাহ; তাওয়াফ করেন প্রাণের কাবা এবং চুম্বন করেন জান্নাতের কৃষ্ণ পাথর। পুরো সময় উটের লাগাম ধরে চলেছেন রাসুলের কবি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এবং হৃদয়ের উদ্গত উচ্ছ্বাসে আবৃত্তি করছেন স্বরচিত কবিতাÑ ‘ওরে অবিশ্বাসী সন্তানেরা সব, যা সরে যা পথ ছেড়ে দে! তার সাথেই তো রেখেছি বেঁধে, মঙ্গল আর সৎকাজে। মেরেছি তোদের কোরআন মেনে, করেছি ভিন্ন শরীর-মাথা; বন্ধু ভুলেছে বন্ধুকে আর ঈমান এনেছি তো এক প্রভুতে।’

এক সময় তেতে ওঠেন ওমর রা.। ধমক দিয়ে বলেনÑ আল্লাহর পবিত্র হেরেমের আঙিনায় রাসুলের সামনে কবিতা আওড়ানো; এ কী ধৃষ্টতা? রাসূল সা. তাকে শান্ত করেনÑ ওমর! আমি তার কথা শুনছি। আল্লাহর কসম! কাফেরদের ওপর তার কথা তীর ও বর্শার চেয়েও বেশি আঘাত করছে। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার কবিতায় স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সংযুক্তি এনে বলেনÑ আবদুল্লাহ! তুমি এভাবে বলোÑ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহ, নাসারা আবদাহ ওয়া আয়াযযা জুনদাহ, ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহ।’ অর্থ, ‘এক আল্লাহ ছাড়া নেই কোনো ইলাহ। তার বান্দাকে সাহায্য করেছেন তিনি, তার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেছেন এবং একাই প্রতিপক্ষের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেছেন।’ আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা এভাবে ঈমান ও বিশ্বাসের পঙক্তি মেশানো কবিতা আবৃত্তি করে চলেছেন, আর তার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে কোরাস গেয়ে চলেছেন আশপাশের সমবেত সাহাবা কাফেলা।

তারপরের বছরের কথা। অষ্টম হিজরির জুমাদাল উলা মাস। মদিনার বাতাসে শীতের আমেজ। রাসুল সা. বসরার অমুসলিম শাসকের কাছে চিঠি লিখলেন ইসলামের বার্তা জানিয়ে। মদিনা থেকে বসরাÑ মাঝে একটি স্থান মুতা। রাসুলের বার্তা বহনকারী দূতকে সেই মুতায় হত্যা করলো গাসসানের এক খৃস্টান। বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। একজন দূতের মূল্য অনেক। এর বিচার ও প্রতিশোধ অবশ্যই চাই। রাসুল সা. দূত হত্যার স্থান মুতায় সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করলেন। তিন হাজার মুসলিম যোদ্ধা। তিন জন সেনাপতি। এক সঙ্গে নয় বরং তিন ধাপে। মদিনা থেকে বাহিনী রওনা হওয়ার সময় রাসুল সা. বললেনÑ ‘যায়েদ হবে এ বাহিনীর প্রধান। সে নিহত হলে জাফর ইবন আবু তালেব হবে বাহিনীর প্রধান। জাফরের পর হবে বাহিনীর প্রধান হবে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। আর সেও যদি নিহত হয় তাহলে বাহিনীর সেনারা একজন সেনাপতি নির্বাচন করে নেবে।’ রাসুলের কথা অব্যর্থ তীরের মতোই সত্য। সাহাবায়ে কেরাম আভাস পেয়ে গেলেনÑ যুদ্ধ হবে কঠিন, শহিদ হবেন সবাই!

মদিনা থেকে যাত্রা করছে রাসুলের বাহিনী। রাসুলের কবি এ বাহিনীর একজন সেনাপতি। মদিনার বিখ্যাত সানিয়াতুল বিদায় রাসুল তার বাহিনীকে বিদায় জানান। বিদায় বেলা মদিনাবাসীরা বললেনÑ তোমাদের অভিযাত্রা নিরাপদ হোক! সফল হয়ে ফিরে এসো! সমবেত জনতার কোলাহলের ভেতর কাঁদছেন আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। কয়েক জন তার কান্নার কারণ জানতে চাইলে বললেনÑ দুনিয়ার মুহব্বতে তো কাঁদছিনা! ‘তোমাদের সবাইকেই পুলসিরাত অতিক্রম করতে হবে। এটা তোমার রবের অনিবার্য সিদ্ধান্ত’  পাঠ করে বলেনÑ আমি কি সেই পুলসিরাত পার হতে পারবো? লোকেরা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনÑ আল্লাহ তোমাকে রাসুলের সঙ্গে আবার মিলিত করবেন। তখন তিনি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেনÑ ‘তবে আমি রহমানের কাছে মাগফিরাত কামনা করি; আর কামনা করি তলোয়ারের অন্তরভেদী একটি আঘাত অথবা কলিজা ও নাড়িতে গেঁথে যাওয়া নেজার আঘাত! মৃত্যুর পর আমার আমার কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রমকারী যেন বলেÑ হায় আল্লাহ! সে কত ভালো যোদ্ধা ও গাজি ছিলো!’

মদিনা বের হয়ে সিরিয়ার মায়ান শহরে উপস্থিত হয় বাহিনী। তখন জানা যায়, রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস এক লক্ষ রোমান সৈন্যসহ সামনে এগুলেই বালকা শহরের মাব প্রান্তরে অবস্থান নিয়েছে। রোমানদের সঙ্গে আরো যোগ দিয়েছে লাখম, জুজাম, কায়ন, বাহরা, বালি প্রভৃতি বিভিন্ন গোত্রের প্রায় লাখ খানেক যোদ্ধা। দুই লক্ষাধিক শত্রুসেনা সমাগমের এ সংবাদ পেয়ে মাত্র তিন হাজার মুসলিম যোদ্ধার বাহিনী আপাতত সেখানেই যাত্রাবিরতি কওে, দুই দিন ধরে চিন্তা-ভাবনা ও পরামর্শ হয়। কেউ কেউ মত দেনÑ শত্রুপক্ষের সৈন্যসংখ্যা ও প্রস্তুতির সব সংবাদ রাসুলকে জানানো হোক। তিনি আমাদেরকে অতিরিক্ত সৈন্য দিয়ে সাহায্য করবেন অথবা অন্য কোনো নির্দেশনা দেবেন। আর আমরা সেই মোতাবেক পদক্ষেপ নিবো। মুসলিম বাহিনীর ভেতর দ্বিধাদ্বন্দ্বের এমন দোলাচল দেখে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। তিনি বলেনÑ ওহে আল্লাহর কাফেলা! এখন তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হতে চাইছো না; অথচ তোমরা সবাই শাহাদাত লাভের উদ্দেশ্যে বের হয়েছো। আমরা তো শত্রুর সাথে সংখ্যা, শক্তি ও আধিক্যের দ্বারা লড়াই করি না। আমরা তো লড়াই করি ঈমান ও দ্বীনের শক্তি দিয়ে; যে দ্বীনের দ্বারা আল্লাহ আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। তোমরা সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ো। তোমাদের সামনে আছে দুইটি কল্যাণের যে কোনো একটি; হয় বিজয়ী হবে নতুবা শাহাদাত লাভ করবে! সৈনিকদের ভেতর জেগে ওঠে অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্য। সবাই সমস্বরে বলে ওঠেÑ আল্লাহর কসম! ইবনে রাওয়াহা ঠিক কথা বলেছেন। সব দ্বিধা ঝেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায় বাহিনী। মুখোমুখি হয় মাব প্রান্তরের দুই লক্ষাধিক দুশমনের। তখন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা. একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে বাহিনীর সঙ্গে ঢেউয়ের মতো আন্দেলিত হয়ে এগিয়ে চলেন।

রাত নেমে এলে সেখানেই অবস্থান নেন তারা। ময়দানের এক প্রান্তে বিশ্বসীদের বাহিনী, অপর প্রান্তে অবিশ্বাসীদের বাহিনী। সে রাতে একটি মর্মস্পর্শী কবিতা আবৃত্তি করছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। আবৃত্তি শুনে যায়েদ ইবন আরকাম রা. কাঁদতে শুরু করেন। তিনি যায়েদ রা.-এর মাথার ওপর ধারালো অস্ত্র উঁচু করে ধরে বলেনÑ তোমার কী হয়েছে? আল্লাহ আমাকে শাহাদাত দান করলে তোমরা নিশ্চিন্তে ফিরে যাবে। তারপর দিনের আলো জেগে উঠলে শুরু হয় যুদ্ধের সাজ সাজ রব।

মুতার মাব প্রান্তরে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। আকাশে মরুধুলো তুলে ঘোড়ার হ্রেসাধ্বনি, অস্ত্রের ঝনঝনানি, আহতের আর্তচিৎকার আর ঈমানদারদের তাকবির ধ্বনি। মুসলিম সেনাপতি যায়েদ ইবনে হারিসা শহিদ হলেন। পতাকা তুলে নিলেন জাফর ইবনে আবু তালেব। চলছে ঘনঘোর যুদ্ধ। তিনিও শাহাদাত বরণ করলেন। ধুলিঝড় তুলে দ্রুতগামী ঘোড়ার পিঠে ময়দান প্রদক্ষিণ করছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। মুসলিম বাহিনীর পতাকা পড়ে যেতে দেখে এগিয়ে গেলেন তিনি। রাসুলের কবি এখন রাসুলের সেনাপতি। তার হাতে উড়ছে মুসলিম বাহিনীর পতাকা আর দুই ঠোটে দোল খাচ্ছে আবেগঝরা কবিতা। ঘোড়া থেকে নামতে গিয়ে উদ্দীপিত কণ্ঠে আবৃত্তি করতে লাগলেনÑ হে আমার প্রাণ! আমি কসম করেছি, তুমি অবশ্যই নামবে, তুমি স্বেচ্ছায় নামবে অথবা নামতে বাধ্য করা হবে। মানুষের চিৎকার ও ক্রন্দন ধ্বনি উত্থিত হচ্ছে, তোমার কী হয়েছে যে, এখনও জান্নাতকে অবজ্ঞা করছো? সেই কত দিন থেকে না এই জান্নাতের প্রত্যাশা করে আসছো তুমি! পুরোনো ফুটো মশকের এক বিন্দু পানি ছাড়া তো তুমি আর কিছু নও। হে আমার প্রাণ! আজ তুমি নিহত না হলেও একদিন তো তুমি মরবে, সুখময় শাহাদাতের ফুলশয্যা তো এই এখানেই উষ্ণ করা হচ্ছে! তুমি যা কামনা করতে এখন তো তোমাকে তাই দেওয়া হয়েছে, তুমি তোমার পূর্বের দুই সঙ্গীর জীবনকাব্য অনুসরণ করলে পেয়ে যাবে সঠিক পথের দিশা।’

এই কবিতা আবৃত্তি করতে করতে তিনি ঘোড়া থেকে নেমে পড়েন। তার চাচাতো ভাই আগুনে ঝলসানো সুস্বাদু মাংস-জড়ানো একটি হাড় এনে তার হাতে দেন। হাড়ের টুকরো হাতে নিয়ে মাংসে কামড় দিতেই চারপাশ থেকে ভেসে এলো প্রচণ্ড যুদ্ধের শোরগোল। ইতস্তত চারদিকে নজর ঘুরিয়ে ‘তুমি এখনো বেঁচে আছ’Ñ এ কথা বলে হাতের মাংসল হাড় ছুড়ে ফেলে তরবারি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধের শোরগোলের ভেতর। জান্নাতের কাব্য রচনা করতে করতে অনেক দূর  এগিয়ে যান রাসুলের কবি, রাসুলের সেনাপতি, রাসুলের পতাকাবাহী আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। হঠাৎ বৃষ্টির মতো ঝাঁকে ঝাঁকে তীরবৃষ্টি বর্ষণ শুরু হয়। বিশৃংখল করে দেয় তার চারপাশের বাহিনী। একটা তীর এসে বিদ্ধ হয় কবির শরীরে। রক্তরঞ্জিত শরীরে আহ্বান জানান সাথীদের। পুনরায় সবাই ছুটে এসে তাকে ঘিরে ফেলে এবং শত্রু বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মদিনায় বসেই সুদূর শামের ভূমিতে লড়াইরত প্রিয় কবির শাহদাত দৃশ্য অবলোকন করেন রাসুল সা.; উপস্থিত সাহাবীদের সুসংবাদ দেন অনন্ত মহাকালের অভিযাত্রার!

রাসুলের প্রিয় কবি! প্রিয় সাহাবি! প্রিয় নকিব ও হাওয়ারি! বদর, উহুদ, খন্দক, হুদাইবিয়া প্রভৃতি ঐতিহাসিক সব যুদ্ধে এক সঙ্গে লড়েছেন যিনি! অজস্র কবিতা শুনিয়ে মুগ্ধ করেছেন! আজ তিনি নেই! প্রিয় সঙ্গীর ব্যাপারে প্রিয় নবীর স্বাগত উচ্চারণÑ ‘নিমার রাজুলু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা’Ñ আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা কতই না ভালো মানুষ!

হাজারো কাব্যের জীবনকাব্য রচনা করেছেন প্রতিভাবান এই কবি ও সাহাবি। কিন্তু কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে প্রায় সব। তবে অর্ধশতের মতো পঙক্তি রক্ষা পেয়েছে হাদিস, রিজাল, সিরাত ও তারিখের সংকলনের সুবাদে।  এর মাঝেই তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে। মরেও তিনি অমর। তিনি যে আল্লাহর রাস্তায় একজন শহিদ কবি!

 

সূত্র :

 

 

সিরাতে ইবনে হিশাম : ১/৪৪৩; ফাতহুল বারি : ৭/৫১৬; আত-তাবকাতুল কুবরা : ৩/৩৯৮; আর রাহিকুল মাখতুম : ১৫২-১৫৬

আল-ইসাবা : ৪/৭৫; তারিখুল আদাবিল আরাবি : ১/২৫৮, ২৬১, ২৬২

সুরা শুয়ারা : ২২৪-২২৬

আল-ইসাবা : ২/৩০৭; তাবাকাতে ইবনে সাদ : ৩/৫২৮; হায়াতুস সাহাবা : ৩/৭৭, ১৭২

আল-ইসতিয়াব : ১/৩৬২; তাবাকাতে ইবনে সাদ : ৩/৫২৮; আল-ইসাবা : ২/৩০৭

সিয়ারে আনসার : ২/৫৯

তিরমিজি : ২৮৪৭; আল ইসাবা : ২/৩০৭; তাবাকাতে ইবনে সাদ : ৩/৫২৬; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৬/৪৫৬

সুরা মারয়াম : ৭১

সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/৭৪, ৩৭৭; হায়াতুস সাহাবা : ১/৫২৯, ৫৩০

সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/৩৭৫; আসাহহুস সিয়ার : ২৮০

আল-ইসাবা : ২/৩০৭

বোখারি : ২৭৯৮; সিরাতে ইবন হিশাম : ২/৩৭৯; তাবাকাত ইবনে সাদ : ৩/৫২৯; হায়াতুস সাহাবা : ১/৫৩৩; আনসাবুল আশরাফ : ১/৩৮০, ২৪৪

আল-ইসাবা : ২/৩০৬